Homeইন্টারভিউভাষায় প্রাণসঞ্চার হলে সাহিত্যে প্রতিফলন ঘটে

ভাষায় প্রাণসঞ্চার হলে সাহিত্যে প্রতিফলন ঘটে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৬ সালে। তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই কলম ধরেছেন। সমাজ-রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখির জন্য তিনি সুপরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বাঙালি কাকে বলে, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি, বাঙালীর জাতীয়তাবাদ, সাহিত্যের অন্তর্জগৎ, রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি, অন্বেষণ। সাড়ে তিন দিনের পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মার্যিউর রহমান চৌধুরী

আপনি অতীতে বহুবার বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও এ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আর এই মুক্তির জন্য সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগের তাগাদাও দিয়ে এসেছেন। বিষয়টিকে যদি সবিস্তারে আলোচনা করেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ১৯৫২ সাল থেকে ২০২৬ সালÑএই দীর্ঘ ৭৪ বছরের হিসাব করলে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। সম্প্রতি ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি নতুন সংযোজন। তবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতো স্বাধীনতার সংগ্রামকেও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। মূলত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত এবং এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের স্বাধীনতা অর্জন। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে গণমানুষের মুক্তি পাইনি। এই মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন সর্বস্তরে ও সর্বক্ষেত্রে আমরা বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারব। কিন্তু প্রকৃত মুক্তির জন্য বাংলা ভাষার প্রয়োগ কেন জরুরি? এর কারণ হলো, বাংলা ভাষার প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা আরও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারব এবং ঐক্যবদ্ধ হতে পারব। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৭ বছরেও আমরা বাংলা ভাষাকে সর্বজনীন করতে পারিনি। তাই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আমাদের সংগ্রাম এখনও থামেনি এবং তা সামনেও চলবে।

বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের সংগ্রামের বিষয়টি আসলে কেমন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বিষয়টি জটিল। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির একাধিক শত্রু-মিত্র রয়েছে। ভেতরে ও বাইরে সংস্কৃতির প্রতিপক্ষগুলো এখনও জিইয়ে রয়েছে। আর এর বিরুদ্ধে আমরা বরাবরই সমাজবিপ্লবের কথা বলি। কিন্তু এই সমাজবিপ্লব তখনই সম্ভব, যখন সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এ কথা সত্য, সংস্কৃতির আদর্শ নিরপেক্ষ হওয়ার সুযোগ নেই। বিপ্লবীরা সমাজ বদলের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন রূপে সংস্কৃতির চর্চা করবে। আর এ ক্ষেত্রে সাহিত্যের ভূমিকা থাকতে হবে একদম শীর্ষে। সাহিত্যের বাহন যেহেতু ভাষা, তাই ভাষাকে অবারিত করা এবং তাকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উন্নীত করা অত্যন্ত জরুরি। এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার সাহিত্যসম্ভার সমৃদ্ধ হয়েছে নানা সাহিত্যিক, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবীর নিরলস পরিশ্রমের বদৌলতে। কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে বাঙালিকে এখনও সাহিত্য ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ সমাজে শ্রেণিবিভাজন প্রবল। ভুলে গেলে চলবে না, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক। এই জাতীয়তাবাদের বোধের ব্যাপারটা একেবারেই প্রাথমিক। শ্রেণিচেতনার মতো অত শক্তিশালী না হলেও, কাছাকাছি বটে।

কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী বোধ এখনও আমাদের মধ্যে শক্তিশালী কেন হতে পারেনি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : উত্তরটা সহজ। শ্রেণিবিভাজনের কারণে বাঙালি এখনও তার ভাষা দ্বারা বিভক্ত। যেমন অতীতে সাম্প্রদায়িকতা ও আঞ্চলিকতা ছিল। এই সাম্প্রদায়িকতা ও আঞ্চলিকতাকে দূর করার জন্যই আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান সব বাঙালিকে আজও শিক্ষিত করে তুলতে পারেনি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। শিক্ষিত বাঙালিদের সবাই প্রয়োজনের বাইরে শুধু জ্ঞানচর্চার জন্য বই পড়েন না। এদিকে উচ্চশিক্ষিতরা এখন ইংরেজি চর্চায় ব্যতিব্যস্ত। অথচ আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য যে আন্দোলন তার রূপটা ছিল গণতান্ত্রিক, ভেতরের আকাক্সক্ষাটা ছিল সমাজতান্ত্রিক। অস্বীকার করার পথ নেই, ওই পথেই নতুন রাষ্ট্র এসেছে, যে রাষ্ট্রের লক্ষ্য গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, রাষ্ট্র ওই লক্ষ্য থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যেতে থাকল এবং যাচ্ছেও। সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিটি ঘটনা অন্তত সেদিকেই ইঙ্গিত করে।

তার মানে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পরও বাংলা রাষ্ট্র ও সমাজের ভাষা হতে পারছে না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ। এর কারণও স্পষ্ট। একটি বিশেষ শ্রেণি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আদর্শ হিসেবে বিরাজমান। এমন অবস্থায় সংস্কৃতির গতি যেমন শ্লথ হওয়ার কথা তেমনই হয়েছে এবং হচ্ছে। এই শ্লথ গতির বিরুদ্ধে অনেকেই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে যুক্ত রয়েছেন এবং তাদের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু ওই যে, তাদের সামনে সীমাবদ্ধতার দেয়ালটি এখনও অনেক উঁচু। এখনকার পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, আগ্রাসী বিশ্বায়ন বাঙালির জন্য দাঁড়ানোর কোনো জায়গা রাখবে না। ইতোমধ্যে কিছু আলামতও দেখা যাচ্ছে। রবীন্দ্রসংগীতকে এখন পপসংগীত বানানোর প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এমনকি সংগীতের নামে আদিম হল্লার গ্রহণযোগ্যতাই যেন বাড়ছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, যে সংস্কৃতিকে আমরা বাঙালি সংস্কৃতি বলে গণ্য করতে চাইব তার প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। তাকে হতে হবে ঐক্যবদ্ধ ও গণতান্ত্রিক অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক ও ইহজাগতিক, যার মধ্যে থাকবে বাঙালির সংগ্রামশীলতার প্রকাশ। সেই সঙ্গে সে হবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে করা যাবে এই কাজ। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ার একটা উপায় হচ্ছে তাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করা।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসার ও গঠনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় প্রভাব রয়েছে বলেই অনেকের অভিমত। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাঠামোই এমন যে তাদের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যাখ্যান করা কঠিন কিছু নয়। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি মধ্যবিত্তের ভালো সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের তালিকা ছোট নয়। আমরা যে বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয়ে পরিচিত হই, কিছুটা হলেও গর্ব করি, তার গঠনে মধ্যবিত্তের ভূমিকাই প্রধান। এই সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে উচ্চবিত্ত থেকেছে উদাসীন; বিত্তহীনদের কথা আলাদা। এক্ষেত্রে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার কাজটা মধ্যবিত্তই করেছে, তাকেই করতে হয়েছে। না করে উপায় ছিল না। কেননা, সব দেশেই মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিমনস্ক, আমাদের দেশেও তা-ই। আমাদের দেশে হয়তো কিছুটা বেশিই। কেননা, অন্যান্য ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অর্থনীতিতে, আমাদের অর্জনটা উৎফুল্ল হওয়ার মতো নয়, বরং বেশ ম্রিয়মাণ। সেজন্য মধ্যবিত্তের পক্ষে সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যকলা, শিল্পকলার ওপর জোর দিতে হয়েছে। কেননা, সংস্কৃতিতেই সে সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, অন্যত্র নয়। ব্যাপার আরও ছিল, সেটা হলো আত্মপরিচয়। সংস্কৃতি দিয়েই সে নিজেকে পরিচিত করেছে, অন্যের কাছে তো বটেই নিজের কাছেও। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিরই মানুষ। পারিবারিকভাবে রবীন্দ্রনাথরা জমিদার ছিলেন ঠিকই, কিন্তু রুচি ও সংস্কৃতিতে তিনি নিজে ছিলেন মধ্যবিত্ত। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মধুসূদন ও বেগম রোকেয়াও মধ্যবিত্তই। আলাউদ্দিন খাঁ, উদয়শঙ্কর, রবিশঙ্কর, সত্যজিৎ রায়, জয়নুল আবেদীন এই শ্রেণি থেকেই এসেছেন। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সত্যেন বসুÑসবাই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তান।
এখন আমরা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের অবদানের কথা বলি, সেটা ঠিকই আছে। অবদান অস্বীকার করবে কে। কিন্তু এও সত্য, মধ্যবিত্তের কারণেই ওই সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে রয়েছে। তাতে ব্যাপক জনগণের অংশ নেই, যার জন্য প্রাণশক্তিতে সে ক্ষীণ। বলা যায় সংকীর্ণ। সেখানে গণতান্ত্রিকতা নেই, নেই সেই ইহজাগতিকতা যা শ্রমজীবী মানুষের জীবনের বৈশিষ্ট্য। এ দেশের মধ্যবিত্ত ধর্মভীরু, একাংশ সাম্প্রদায়িক, এখন তারা মৌলবাদীও হয়েছে; এই দৃষ্টিভঙ্গি তারা জনগণের ভেতর সংক্রমিত করে দেয়। অতীতে করেছে, এখনও করছে।

একটু আগেই যেহেতু সাম্রাজ্যবাদের প্রসঙ্গ এলো, তার মানে ভাষাও রাজনীতির অধীনস্থ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সহজভাবে এমনটি বলা যাবে না। কারণ বাঙালি সংস্কৃতির অধিকার প্রতিষ্ঠাতেও রাজনৈতিক আন্দোলনের ভূমিকা ছিল। আর এই আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তবে আমরা এ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন রাখতে পারি, ভাষা কি রাজনীতির অধীন? ভাষা কি হুকুমের দাস? অবশ্যই নয়। ভাষা কারও একার সৃষ্টি নয়, কোনো শ্রেণি বা গোষ্ঠীর সৃষ্টিও নয়, যেজন্য ভাষার শব্দ বাড়ে, শব্দের বানান ও উচ্চারণ বদলায়, কিন্তু ব্যাকরণ ঠিক থাকে এবং রাজনৈতিক বিপ্লবের পরেও ভাষা বদলায় না। যেজন্য বলা হয়, ভাষা মূল কাঠামোরই উপাদান বটে, উপরকাঠামোর রাজনীতি এ মূল কাঠামোকে বারে বারে ও নানাভাবে আক্রমণ করতে পারে, করে থাকে।
আমাদের দেশের মানুষ একের পর এক বিদেশিদের ভাষা শিখেছে। ফারসি ও ইংরেজি তাকে শিখতে হয়েছিল, উর্দুও শিখতে হতো। কারণটা ভাষাতাত্ত্বিক নয়, কারণটা রাজনৈতিক। ফারসিচর্চাকে ধর্মীয় আকর্ষণ-উদ্ভূত বিবেচনা করলে ভ্রান্তির পরিচয় দেওয়া হবে, কেননা ফারসি কেবল মুসলমানরাই শেখেনি, সেকালের হিন্দুরাও শিখেছে। ইংরেজি যে কারণে শেখা, ফারসিও সে কারণেই। পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা বিনষ্ট করার উদ্যোগকে ধর্মীয় পোশাক পরানো হয়েছিল বটে; কিন্তু অন্তর্গত অনুপ্রেরণাটি ছিল রাজনৈতিক। আর আজও যে বাংলা ভাষা চলছে না দেশে, তার কারণও অন্য কিছু নয়; নির্ভুলরূপে রাজনৈতিকই। এবং সারা পৃথিবীতে আজ যে ইংরেজি ভাষার এমন দোর্দণ্ড প্রতাপ, এর ব্যাখ্যা ভাষাতত্ত্বের কোনো বইয়ে খুঁজতে গেলে পণ্ডশ্রম হবে, খুঁজতে হবে ইংরেজিভাষীদের রাজনৈতিক আধিপত্যে। রাজনীতির জাল সর্বত্র পাতা, পালাব কোথায়?

আমাদের ভাষা সংস্কৃতির বিকাশে শিক্ষাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : শিক্ষাকে সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এও সত্য, শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের সমষ্টিগত অর্জন মধ্যবিত্তের কারণেই। বিজ্ঞানী হিসেবে যারা বড় মাপের কাজ করেছেন তাদের কেউই মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাইরে নন, আমাদের সামাজিক কাঠামোর বিচারে তা হওয়া সম্ভব ছিল না এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার উপায় নেই। বাংলা ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের বরাবরই শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয়েছে। বিশ্বে এখন বাংলাভাষীর সংখ্যা প্রচুর, ২৫ কোটিরও বেশি হবে; সংখ্যাবিচারে বাংলাভাষী মানুষের স্থান পঞ্চম। কিন্তু আমরা দেখছি, বাংলা ভাষার মর্যাদা খুবই কম, কারণ আমরা সংখ্যায় অনেক হলেও আমাদের সংস্কৃতির ক্ষমতা সামান্য। এটা অনেকটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মতোই; শিক্ষিতের সংখ্যা অনেক কিন্তু গুণগত মান নিম্নগামী।
শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষার বিকাশ সঠিকভাবে সম্ভব হতো যদি প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতে পারত। এ কথা তো সত্য, বাঙালি তার ভাষা নিয়ে গৌরব করে থাকে। আর এমন গৌরবের কারণও আছে। এরমধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট কারণটি হলো, বাংলা ভাষায় উচ্চারণের সঙ্গে লিখিত রূপের নৈকট্য বেশি। আমরা যেভাবে উচ্চারণ করি, সেভাবেই লিখে থাকি। কিন্তু অধুনা দেখা যাচ্ছে, কেবল উচ্চারণে নয়, লিখিত রূপের ওপরেও নিদারুণ হস্তক্ষেপ ঘটছে। প্রমিতকরণের নাম করে ‘ঈ’-কারগুলোকে যাবজ্জীবন নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে। সর্বাধিক অগ্রহণযোগ্য হলো ‘শ্রেণি’ বানানে ‘ই’-কারের প্রয়োগ। শাসকশ্রেণি মনে হয় শাসিতশ্রেণিকে অন্যদিক থেকে তো বটেই, বানানের ক্ষেত্রেও হ্রস্ব করে ছাড়বে; কোনো ক্ষেত্রেই রেহাই দেবে না।
শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাভাষার অবস্থা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে। এ-শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই যে স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাবে তা নয়, অনেকেই দেশে থেকে যাবে এবং আগামী দিনে আমলাতন্ত্রের উচ্চতর স্তরে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, বিভিন্ন পেশায় এবং রাজনীতিতেও এরা নেতৃত্ব দেবে। ওই নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনই ইংরেজি-মিশ্রিত বাংলায় কথা বলে, ভবিষ্যতে মিশ্রণটা থাকবে না, ইংরেজিতেই কথা বলতে পছন্দ করবে। এবং যারা পারবে না তারা নিজেদেরকে হীনজ্ঞান করা শুরু করবে। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোই অবশ্যই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধান ধারা। কিন্তু এই ধারা ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে।

বাংলা ভাষার ক্ষমতাহীনতা কেন এখনও এত প্রকট?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এর একাধিক কারণ রয়েছে। প্রধান ও প্রাথমিক কারণটা হলো জ্ঞানচর্চার অপ্রতুলতা। জ্ঞানচর্চা ঠিকমতো হচ্ছে না। তার কারণ হলো, চর্চা যেটুকু যা হচ্ছে, তা বাংলা ভাষার মাধ্যমে ঘটছে না। জ্ঞানই যে শক্তিÑএ সত্যে কোনো ভেজাল নেই। জ্ঞানের চর্চায় আমরা উঁচুতে উঠতে পারছি না; মেধা ও মনন অবিকশিত রয়ে যাচ্ছে। ফলে ক্ষমতা বাড়ছে না। আমরা তরল হচ্ছি, ঘন হতে ব্যর্থ হয়ে। বিশ্বে তাই বাঙালির কোনো সম্মান নেই। ওদিকে সব বাঙালি বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। কেননা, বাংলাদেশই হচ্ছে বাংলা ভাষা চর্চার কেন্দ্রভূমি এবং ভরসাস্থল। এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে; এর রাষ্ট্রভাষা বাংলা; এখানে যদি ভরসা না থাকে, তবে থাকবে কোথায়? থাকছেও না।
আরেকটা বিষয় হলো, বিশ্বপুঁজিব্যবস্থার কারণেই বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারেনি। বাংলাদেশ যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে, তা পুঁজিবাদের পেছনে ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে। কথিত যে কাঠামোর ওপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে, তা খুবই ভঙ্গুর এসব কারণেই, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি বিশ্বমানের হতে পারেনি। রাষ্ট্রের দৈন্যয় বাংলা বৈশ্বিক রূপ পায়নি। আমাদের এখানে আসলে সত্যিকার অর্থে সামাজিক বিপ্লব হয়নি। সামাজিক বিপ্লবের সুফল গণমানুষের কাছে পৌঁছায়নি বলেই আমরা জাতি হিসেবে আজও কাক্সিক্ষত মাত্রায় সমৃদ্ধ হতে পারিনি। আর এ কারণে আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হতে পারেনি। ভাষার জন্য জাতি রক্ত দিলো। আর সেই রক্তের ওপর ভর করে একটি রাষ্ট্র দাঁড়াল। অথচ আজও বাংলা ভাষার সর্বত্র প্রয়োগ হলো না। রাষ্ট্র তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা জারি করে বৈষম্য বজায় রেখেছে। যারা উচ্চবিত্ত তারা ইংরেজি শেখেন। আর মধ্যবিত্তের যারা বাংলা শেখেন, তাদের মধ্যে গভীর কোনো চর্চা নেই। প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বই এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের মাতৃভাষায় বই বিতরণ অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। আশা করব, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য শুধু প্রাক-প্রাথমিক নয়, এই ব্যবস্থা যেন অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়। একটি সভ্য রাষ্ট্র এবং সভ্য জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, দেশের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা করা।

অর্থাৎ বাংলা ভাষার ক্ষমতায়ন সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগত স্থবিরতার কারণে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ছাপান্ন বছরেও সর্বস্তরে বাংলা চালু করা যায়নি। উচ্চ আদালতে তার ব্যবহার এখনও নেই বললেই চলে, উচ্চশিক্ষায় সে অব্যবহৃত, উচ্চ প্রশাসনে উপেক্ষিত, উচ্চ শ্রেণিতে অসম্মানিত। দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে এই, সংবাদপত্র ও আকাশমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে, তাদের ভেতর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তারা জনগ্রাহ্য প্রসঙ্গগুলোকে সামনে আনার ব্যাপারে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষার প্রশ্নের চেয়ে অধিকতর জনগ্রাহ্য প্রসঙ্গ আর কী-ই বা হতে পারে?

অথচ বাংলায় রয়েছে উৎকৃষ্ট সাহিত্য। এরপরও প্রশ্ন হচ্ছেÑতাহলে অন্তরায়টা কোথায়?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বলতে হবে, অভাব আছে সদিচ্ছার। কিন্তু কার ইচ্ছার কথা বলা হচ্ছে? ব্যক্তির, নাকি প্রতিষ্ঠানের? ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা কিন্তু অনেক আগেও দেখা গেছে, এখনও যে দেখা যায় না তা নয়, তবে তাতে কাজ হয়নি, বাংলা চলেনি। বাংলা ভাষার শত্রু অন্য কেউ নয়। শত্রু হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণি এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভু। ভাষার লড়াইটা আসলেই একটা রাজনৈতিক লড়াই, আগেও ছিল, এখনও রয়েছে। এ দেশে বাংলা তখনই সর্বস্তরে ও সর্বপর্যায়ে চালু হবে যখন এ রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হবে, তার আগে নয়। ভাষা প্রচলনের চেষ্টাকে তাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এর বাইরের কাজগুলো হবে সংস্কারমূলক, তাতে অর্জন কিছু ঘটলেও তা বিস্তৃত হবে না, তাদের ধরে রাখাও সম্ভব হবে না।

এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী তবে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : মাতৃভাষার বিকাশের জন্যে এর চর্চা, গবেষণা করে বই লেখা এবং অনুবাদ করা দরকার। এ বিষয়ে পাঠ্য বই, সহায়ক বা রেফারেন্স বই লেখা দরকার। আমাদের এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এখনও বাংলা ভাষাভাষী জনগণ আছে এবং তাদের ভাষাও থাকবে। কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব জুড়ে যে বাঙালিরা রয়েছে, তাদের ভাষা অবশ্যই নিজের জন্য মর্যাদার স্থান খুঁজে নেবে। কিন্তু এই ভাষার গতিশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্বটা বাংলাদেশের মানুষেরই। এর নেতৃত্ব তাদেরই দিতে হবে। বাংলা ভাষার উৎকর্ষ ও প্রয়োগ বৃদ্ধির জন্য আমরা বিভিন্ন কাজের সুপারিশ করতে পারি। যেমন পাঠাগার গড়ে তোলা; সংস্কৃতিচর্চার গুণ ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি। বলতে পারি ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণের আবশ্যকতার কথা। সাহিত্যচর্চার অপরিহার্যতার বিষয় তুলে ধরতে পারি।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক পরিসরে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে সমাজ বিশ্লেষক হিসেবে আলোচনার ক্ষেত্রে আপনি প্রায়শই বলেছেন, সাহিত্য বা শিল্পে ভাবের সত্যকে উপলব্ধির জন্যে কল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই কল্পনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভাষার দরুন। বিষয়টি যদি সবিস্তারে বলেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সাহিত্য বিষয়ে আমার বেশ কিছু লেখা রয়েছে। কারণ, পেশাগতভাবে আমি সাহিত্যের পঠন-পাঠনের সঙ্গে যুক্ত। আর সাহিত্যের এই পঠন-পাঠনের চর্চার কারণেই গদ্যের শিল্পরীতি আয়ত্ত করতে পেরেছি। এ বিষয়টি প্রবন্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষার প্রকাশের ক্ষেত্রে সাহিত্যগুণকে গুরুত্ব দিতে হয়। যদি তা করা সম্ভব না হয়, তখন লেখার মধ্যে প্রাণ আসে না। ভাষার প্রবহমানতা এক জিনিস, আবার ভাষার মধ্যে সঞ্চারিত প্রাণ ভিন্ন এক বিষয়। আমি যখনই লিখি বা লেখার চেষ্টা করি, তখন তা যেন মানুষের বোধগম্য হয় এমন একটি ভাবনা কাজ করে। যদি পাঠক না-ই বুঝতে পারে তাহলে লেখার সার্থকতা থাকে না। আমাদের সময়ে অনেকেই লিখতেন বেশ পাণ্ডিত্য নিয়ে; আর অনেক কঠিন কঠিন সব শব্দ ব্যবহার করতেন। সেসব লেখা পড়তে গিয়ে মনে হলো, এ ধরনের লেখা পড়তে গেলে পাঠক শব্দগত ঝামেলায় পড়বেন। তাই প্রথম থেকেই লেখার বিষয়ে আমাকে সচেতন থাকতে হয়েছে। আমার যেকোনো প্রবন্ধ বা পাণ্ডুলিপি দেখলে বুঝবে কতবার যে শব্দ, লাইন কাটাকাটি করেছি। আমার কাছে কোনো কিছু লেখা মানেই হলো আমি যা বলতে চাই তা যেন, কেউ পড়া মাত্র বুঝতে পারে।
এই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। কারণ এভাবে সচেতনতা বাড়ে। এখন দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্র ও তার কাজকর্ম সম্বন্ধে সচেতন। তরুণরা সচেতন বেশ ভালোভাবে। এই সচেতনতা মোহমুক্তির, একে দাবিয়ে রাখা হয়; তবে, হঠাৎ হঠাৎ, সাময়িক আন্দোলনে তার প্রকাশ ঘটে। এই তরুণরাই ভরসা। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি শুধু যে স্বাধীনতার জন্য তা তো নয়, যুদ্ধ করেছি শ্রেণিবৈষম্য দূর করার জন্যও। শ্রেণিবৈষম্য দূর হবে কী, বরঞ্চ অনেক বেড়েছে। এই জায়গা সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় আমি জনগণের অনুভবের ভাষা বুঝতে সক্ষম হই। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ভাষার মধ্যে তখন প্রাণ সঞ্চারিত হয় যখন সেই ভাষার সাহিত্য কোনো কিছুর প্রতিফলন ঘটায়। এজন্যই ভাষার বিকাশে সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য অনেক কিছুকেই প্রতিফলিত করে; ভাষা ব্যবহারে উৎকর্ষকে তো অবশ্যই। সাহিত্যের মাধ্যমেই ভাষার সর্বোৎকৃষ্ট বিকাশ ঘটে থাকে। আমাদের দেশে এখন অনেক বই প্রকাশিত হয়। বইমেলাতে বইয়ের প্রকাশের ক্ষেত্রে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। সমস্যা হলো, অধিকাংশ বইয়ের ভেতরকার সারবস্তু অকিঞ্চিৎকর। এর ভাষাগত সৌকর্য্য নিয়েও নানা প্রশ্ন থাকে। প্রচুর সংখ্যায় বিক্রি হয় উপন্যাস ও উপন্যাসসদৃশ রচনা। জনপ্রিয় এই ধারা পাঠকদের জন্য এক ধরনের আমোদ সরবরাহ করে। অল্প সময়ের জন্য হলেও বাস্তব জগৎকে ভুলিয়ে দেয়। ফলে পাঠকদের একটা রুচি তৈরি হয়। এই রুচি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণের জন্য মোটেই অনুকূল নয়, বরং প্রতিকূল বটে।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Mehedi Hasan

Muzharul Islam

Md.-Abdur-Razzak

Mahrukh-Mohiuddin-2