Homeইন্টারভিউভাষার ভিত্তিতে ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনা সহজ নয়

ভাষার ভিত্তিতে ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনা সহজ নয়

শিশির ভট্টাচার্য্য একাধারে একজন ভাষাবিজ্ঞানী, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ব্যাকরণচর্চা নিয়ে কাজ করছেন। তবে ব্যাকরণচর্চার বাইরেও বর্তমানে বাংলা ভাষার সংকট, বাংলার প্রচার-প্রসার ও উৎকর্ষের বিষয়ে নিয়মিত প্রবন্ধ লিখে চলেছেন। প্রতিটি লেখায় যুক্ত করছেন ভাষার বিকাশ ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও রাষ্ট্রের করণীয়কে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা করছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো : যা কিছু ব্যাকরণ নয়, বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারী সমাধান, অধিবর্ষে ভাষা ভাবনা ইত্যাদি। সাড়ে তিন দিনের পত্রিকার পক্ষে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিরুল আবেদিন

আপনাকে আমরা ভাষাবিজ্ঞানী চিন্তক বলেই অনেক বেশি চিনি। আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনে আপনি ভাষাকে আয়ত্ত করতে চেয়েছেন। আপনার কাজের পরিধিও এই ভাষাকেই কেন্দ্র করে। একাডেমিয়ার নিরিখে আপনি ভাষাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : এ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আলোচনা অনেক বড় হয়ে যাবে। তাই সংক্ষেপেই বলি। হ্যাঁ, ভাষা নিয়েই আমার কাজ। প্রকৃতপক্ষে আমি একজন ভাষাবিজ্ঞানী। তবে শুধু ভাষাবিজ্ঞানী পরিচয়টি দিয়েই আমার কাজকে মূল্যায়িত করা কঠিন। কারণ, বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গার পাশাপাশি আমাকে সৃজনশীল রচনার দিকেও মনোযোগ দিতে হয়। সেক্ষেত্রে ভাষাকে আমি সংস্কৃতি, রাজনীতি, কাঠামোগত, আর্থ-সামাজিকÑএসব পরিসরেই ব্যাখ্যা করে এসেছি। এ নিয়ে আমার একাধিক বইও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হিসেবে আমাকে একাধিক ভাষা নিয়ে কাজ করতে হয়। তবে আমি সবসময়ই বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসার নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি। বিশ্বায়নের এই যুগে একটি ভাষার ভিত্তিতে আসলে ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। কিন্তু আলোচনার ভিত্তিভূম আমি সবসময়ই বাংলা ভাষাকে নিয়ে করে থাকি। ভাষা নিয়ে একাডেমিয়ায় আমার যে ধারণা সেখানে ভাষার গাঁথুনির মধ্যে যুক্তিকেই আমি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের মধ্যে এখনও ভাষাকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আবেগের প্রাধান্য বেশি থাকে।

ভাষার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আবেগের প্রভাব বেশি—এই বিষয়টিকে যদি ব্যাখ্যা করতেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : দেখুন, প্রতিবছর যখনই ফেব্রুয়ারি মাস আসে, তখন সারাদেশেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে দৃশ্য, পাঠ্য ও শ্রাব্য মিডিয়ায় অনেক কাজ দেখতে পাওয়া যায়। খোদ বইমেলাই এ সময় সবচেয়ে বড় আয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই অভিযোগ করছেন, তারা অতীতের সেই ভাষার ফেস্টিভ আবহের জৌলুসটুকু দেখতে পাচ্ছেন না। এখানে ভাষাকে নিয়ে যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণের চেয়ে আবেগ বেশি দেখা যায়। যেমন, অনেকেই দাবি করেন বাংলা একটি শুদ্ধ-পবিত্র ও সুন্দর ভাষা। এখন যখনই কেউ এমন দাবি করেন, তখন ধরেই নিতে হয় এমন কিছু ভাষাও আছে, যেগুলো ‘অশুদ্ধ-অপবিত্র-অসুন্দর’। অথচ ভাষাবিজ্ঞান তো এই বিভাজন স্বীকার করে না। সব ভাষাই আসলে শুদ্ধ-পবিত্র-সুন্দর হবার কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো ভাষা শুদ্ধ-পবিত্র-অসুন্দরÑএমন ধারণার ক্ষেত্রে মানদণ্ড আসলে কী? মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ভাষাই কারও না কারও মাতৃভাষা। ‘মাতৃভাষা’ বাংলা যদি সুন্দরী হয়ে থাকে, তবে ‘ধাত্রীভাষা’ ইংরেজি বা ফরাসিও কুরূপা-কুৎসিৎ হবার কোনো কারণ নেই। তবে যেহেতু বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, তাই আমাদের বাংলাকে কেন্দ্র করেই অন্য ভাষার তুলনামূলক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
এক্ষেত্রে আলোচনাটুকু কেমন হওয়া উচিত? ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আসলে অনেকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বলেন, ভাষার দূষণ ঘটছে। বাস্তবে, ভাষাদূষণ বলে কিছু ঘটে না। কারণ, ভাষা পুরোপুরি জীবন্ত। এজন্য ভাষাকে শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। ভাষাকে তার নিজের মতো চলতে দিতে হবে। এ বিষয়ে আমি বহু প্রবন্ধে লিখেছি, ভাষা শুধু আবেগেরই নয়, এটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিকও বটে। আর এই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, ভাষাকে তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ থেকেও বিচার করতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি, বাংলা ভাষা বা অন্য যেকোনো ভাষার প্রভাব সংস্কৃতিতেও পড়ে। এজন্য টিভি, সিরিয়াল ও সংবাদপত্রের ভাষাকে নিয়ে কিছু সমালোচনা থাকে। বলা হয়, ভাষাদূষণের জন্য এফএম রেডিও বা টেলিভিশনের নাটক-সিরিয়াল দায়ী নয়। রেডিও শুনে বা টেলিভিশন দেখে কেউ ভাষা শেখে না। রেডিও বা টেলিভিশন সেই ভাষাই ব্যবহার করে, যে ভাষায় শ্রোতা বা দর্শক কথা বলে। এফএম রেডিওর পক্ষে বাংলা ভাষা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এখানে যা হচ্ছে তা ভাষাদূষণ নয়, ভাষামিশ্রণ। আবার সাহিত্যে যেভাবে ভাষার ব্যবহার হয় সেটি সর্বোপরি পাঠকের, বুদ্ধিজীবীর ও চিন্তকদের ক্ষেত্রেই বেশি কার্যকর বলে মনে হয়। এখানেও মিশ্রণ ঘটে। আমার এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে ভিন্নমত অবশ্যই রয়েছে। তবে আমি এভাবেই দেখি।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন চলে আসে। ভাষার বিকাশে অন্য ভাষার শব্দের প্রভাব রয়েছে। এর নিরিখে বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : দেখুন, যেকোনো ভাষাকে নতুন শব্দ সৃষ্টি করতে হয়। নতুন অর্থে পুরোনো শব্দ ব্যবহার করতে হয় এবং অন্য ভাষা থেকে ঋণ নিতে হয়। বাংলা এককালে সংস্কৃত, ফারসি, আরবি থেকে ঋণ নিয়েছে, এখন নিচ্ছে ইংরেজি থেকে। এক্ষেত্রে কোনো নিষ্ঠাবান পণ্ডিত ভাবতে পারেন, ‘হাওয়া’, ‘খুন’, ‘সিন্দুক’-এর মতো শত শত আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে ‘অপবিত্র’ করেছে। আবার কোনো বুজুর্গ বিশ্বাস করতে পারেন, ‘বেদি’, ‘স্নাতক’, ‘লক্ষ্মী’র মতো হাজার হাজার সংস্কৃত শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে ‘নাপাক’ করে দিয়েছে। এসব ধারণা ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে নিছক কুসংস্কার বলে মনে করি। অন্য ভাষা থেকে শব্দ নিলে যদি ভাষা কলুষিত হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে আরবি, সংস্কৃতসহ সব ভাষাই কমবেশি কলুষিত। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-শামসুর রাহমান- জগদীশ চন্দ্র-রোকেয়া যে ভাষায় লিখেছেন তাতেও প্রচুর বিদেশি শব্দ ছিল। কিন্তু এসব বিদেশি শব্দের উপস্থিতি তাঁদের সাহিত্যসৃষ্টিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটিয়েছেÑএমন অভিযোগ কেউ করেননি।
আমি মনে করি, ভাষাকে দুই একজন নগর পরিকল্পনাকারীর সচেতন নির্মাণ হিসেবে ভাবা সম্ভব নয়। বরং বলা যায়, ভাষা গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথের মতো বহু মানুষের অসচেতন নির্মাণ। কোনো একক মানুষ বা মানবগোষ্ঠীর পক্ষে সচেতনভাবে তার ভাষাকে বদলানো সম্ভব নয়। ভাষা এমন একটি সিস্টেম বা সংশয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলায়। বিভিন্ন কারণে একটি ভাষার মধ্যে বহু লক্ষ ‘বিদেশি’ শব্দ এসে ভাষাটিকে প্রবহমান, জীবিত রাখে। এতে ভয়ের কিছু নেই। স্বাগতিক ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ শব্দগুলোর উচ্চারণ এমনভাবে বদলে নেয় যে শব্দগুলো আর বিদেশি থাকে না। আমরা দেখছি, আজ বাংলা ভাষায় বন্যার জলের মতো যত ইংরেজি শব্দ ঢুকছে। এমনটি ইতিবাচক বলেই দেখি। বাংলা ভাষায় এখন অনুবাদের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন ভাষা শেখার আগ্রহও প্রবল হতে শুরু করেছে। বাংলা ধ্বনিতত্ত্বের নিয়মেই সেগুলো বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দসম্পদ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আমাদের একটি নিজস্ব বাংলা ভাষারীতি প্রয়োজন। এই ভাষারীতির নিরিখে সরকারিভাবে বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। এই কাজটি শুধু বইমেলা বা ফেব্রুয়ারি মাস এলেই করলে হবে না। ভাষার বিকাশে সংবাদমাধ্যম, প্রকাশনা এবং সাহিত্য অঙ্গনের আলাদা আলাদা ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও অধ্যাপনা ও গবেষণার আলাদা ভূমিকা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয় এবং তুলনামূলক আলোচনার পরিসর বছরব্যাপী করতে হবে।

অর্থাৎ বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে আপনি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা
বলে দেখেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : কিছুটা অবশ্যই। এ বিষয়টিকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সাংবিধানিকভাবে বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। সমস্যা হলো, এটা আইনগত হলেও কার্যত নয়। আদালতের রায় দেওয়ার সময়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার হয় না। এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিসন্দর্ভগুলো ইংরেজিতে লিখতে উৎসাহ দেওয়া হয়। এভাবে দেখলে বাংলা ভাষা আমাদের দেশে ইংরেজির তুলনায় পিছিয়ে আছে। ইংরেজি আমাদের ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের অংশ। আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি আমরা অবশ্যই শিখব, কিন্তু বাংলাকে বাদ দিয়ে তা হওয়ার কথা ছিল না। কোনো ভাষা শেখার জন্য সেই ভাষাটিকে শিক্ষার মাধ্যম করা অপরিহার্য নয়। ভাষা শুধু আবেগের ব্যাপার নয়। ভাষার সঙ্গে অর্থনীতির প্রশ্ন জড়িত। একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে শতভাগ মানুষ শিক্ষিত হওয়ার নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। সমস্যা হলো, আমরা সেই টেকসই উন্নয়ন করতে পারছি না।

এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা আসলে কী বলে মনে করেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : একটু ইতিহাস দিয়ে বিচার করা জরুরি। ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির পূর্বে পৃথিবীতে ‘রাষ্ট্র’ বা ‘জাতিরাষ্ট্র’ বলে কিছু ছিল না। বিভিন্ন সাম্রাজ্য ছিল এবং কোনো একটি ভাষা বিচিত্র কারণে সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দাপ্তরিক ভাষাটি যে সব সময় শাসকের বা সংখ্যাগুরুর ভাষা হতো, তা কিন্তু নয়; কিন্তু চাকরিপ্রত্যাশী লোকজন সেই ভাষাটি, যেভাবেই হোক, শিখে নিতো। মধ্যযুগের সুলতানী ও মোঘল আমলে ভারতবর্ষের দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফার্সি। হিন্দু ও মুসলমান উভয় জনগোষ্ঠীই ফার্সি শিখতো সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি পাবার আশায়। ইউরোপেও লোকজন লেখাপড়া করে রাজসরকারে একটি চাকরি পাবার আশায় ল্যাটিন শিখতো। অষ্টাদশ শতক থেকে ভারতবর্ষে ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা করা হয়েছিল। ইংরেজি ছিল অতি সংখ্যালঘু বিদেশি শাসকের মাতৃভাষা।
ফরাসি বিপ্লবের পর যখন ইউরোপে একেকটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করল, তখন দেখা গেল, কাকতালীয় বা আর্বিত্রিক সীমানাভাগের কারণে একই জাতিরাষ্ট্রের সীমানার অভ্যন্তরে একাধিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। সাম্রাজ্যের সঙ্গে জাতিরাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষার অন্যতম পার্থক্য হচ্ছে, জাতিরাষ্ট্রে ভাষীর সংখ্যার ওপরে ভাষার গুরুত্ব নির্ভর করে, যার মানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই জাতিরাষ্ট্রের দাপ্তরিক বা রাষ্ট্রভাষা হয়। এই ভাষাতেই প্রশাসনের কাজ চলে, বিচারালয়ে বিচার হয় এবং শিক্ষার মাধ্যমও হয় রাষ্ট্রভাষা।
এর সুবিধাও আছে, অসুবিধাও আছে। যে জাতির ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়, সে জাতিকে ভাষাটি আর নতুন করে শিখতে হয় না। তাছাড়া মাতৃভাষা বা প্রথম ভাষা বলে ভাষাটির ওপর তাদের দখলও বেশি থাকে; কিন্তু যে জাতির মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হয় না, সে জাতির সমূহ বিপদ। তাকে বাধ্য হয়ে নতুন একটি ভাষা শিখতেই হয়। ভাষা না শিখলে বা শিখতে না পারলে সেই জাতি বহুবিধ সুবিধাবঞ্চিত হয়ে পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। ঠিক এই কারণেই ১৯৪৮Ñ৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়েছিল। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।’ না, পাকিস্তানিরা আমাদের মাতৃভাষা কেড়ে নিতে চায়নি। আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার না করে ‘হয়তো’ আমাদের সুবিধাবঞ্চিত করতে চেয়েছিল। বাঙালি উর্দু শিখে সরকারি কাজকর্ম পেতে এতটাই দেরি হয়ে যেত যে, ততদিনে যাবতীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পাকিস্তানের উর্দুভাষী লোকজনের কুক্ষিগত হয়ে যেত।
আমি ‘হয়তো’ বললাম এ কারণে যে উর্দু পাকিস্তানের কোনো ভাষা ছিল না। পাকিস্তানের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী যেমন সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বালুচ, পাঠানকেও উর্দু শিখতে হতো। তবে এদের শিক্ষিত সমাজ আগে থেকেই উর্দু কিছুটা জানতো। কারণ, উর্দু আর হিন্দি দেশভাগের বহু আগে থেকেই ভারতবর্ষের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ছিল। এ ছাড়া যেহেতু আরবি বর্ণমালা দিয়ে উর্দু লেখা হয়, আরবি বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয়ও তাদের উর্দু শেখার পথ সুগম করত। আরবি বর্ণমালা দিয়ে বর্ণগুলো লেখা হওয়ায় পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী ও শাসকরা আরবির সঙ্গে উর্দুকে গুলিয়ে ফেলেছিল এবং উর্দুকে তারা ইসলামি ভাষা মনে করত। উত্তর ভারতের লোকজন পূর্বভারতের অধিবাসীদের যে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ঈর্ষা ও ঘৃণা করে আসছে, তার প্রমাণ মহাভারত ও পুরাণে আছে।
সাধারণত মনে করা হয় যে জাতিরাষ্ট্রের একটাই দাপ্তরিক ভাষা থাকা উচিত, কারণ একাধিক দাপ্তরিক ভাষা ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠনের অন্তরায়। এই অজুহাতে ১৯৫২ সালে বাঙালি শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল পাকিস্তানিরা। জাতিগঠনের জন্য এক রাষ্ট্রভাষা থাকা অপরিহার্য নয়। বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, ফিলিপাইন ইত্যাদি রাষ্ট্র যেখানে একাধিক রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃত, সেই রাষ্ট্রগুলোর সমৃদ্ধিও এক রাষ্ট্রভাষার দাবিকে ভুল প্রমাণ করে। ভাষার সংখ্যার বিচারেও একাধিক ভাষা, যেমন উর্দু এবং বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে কোনো বাধা ছিল না।
বেলজিয়ামে ফরাসি এবং ডাচ উভয়ই দাপ্তরিক ভাষা, কারণ গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যক লোক এই দুই ভাষায় কথা বলে। সুইজারল্যান্ডে ফরাসি, জার্মান ও ইতালিয়ান দাপ্তরিক ভাষা হবার কারণও ভাষার সংখ্যা। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে সর্বমোট ১৯৫টি জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৮টির স্বীকৃত দাপ্তরিক ভাষা রয়েছে, যার মধ্যে ১০১টি রাষ্ট্রে একাধিক রাষ্ট্রভাষা আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং অস্ট্রেলিয়ার কোনো স্বীকৃত বা ডি জুরো দাপ্তরিক ভাষা নেই। ইতালিরও ছিল না, তবে অতিসম্প্রতি, ১৯৯৯ সালে, ইতালীয় ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইতালির সরকার। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে ডি জুরো দাপ্তরিক ভাষা এশটিই : বাংলা। ১৯৮৭ সালের বাংলা প্রচলন আইন অনুসারে বাংলায় শিক্ষা, বিচার ও দাপ্তরিক কাজকর্ম না করা শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
ওপরের পরিসংখ্যানের অর্থ হচ্ছে, পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত জাতির ভাষিক অধিকার স্বীকার করে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ রাষ্ট্র এই অধিকার স্বীকার করে না। বাকি ১০ শতাংশ রাষ্ট্র ডি জুরো দাপ্তরিক ভাষার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না।

অর্থাৎ প্রতিটি ভাষাই একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত?

শিশির ভট্টাচার্য্য : হ্যাঁ। ভাষার রাজনৈতিক দিক রয়েছে। এই রাজনৈতিক দিকটি মূলত চারটি স্বীকৃতি অর্জনের প্রতিযোগিতা; অর্থাৎ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সবশেষে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এই মুহূর্তে ইংরেজি ভাষার চারটি স্বীকৃতিই আছে। সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার ভাষায় আবার এই স্বীকৃতির কোনো না কোনো একটি থাকে না। যখন এই স্বীকৃতি থাকে না, তখন ভাষা সাধারণত সাহিত্যের বাহন হতে পারে না।
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে তা সাহিত্যের বাহন হওয়ার পেছনে দাপ্তরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বড় প্রভাব ছিল। এই যেমন, মধ্যযুগে বাংলার সুলতানেরা তৎকালীন প্রমিত বাংলায় সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দিয়েছিলেন। ওই সময় বাংলার একটা সামাজিক স্বীকৃতি ছিল। ওই সময় ভাষা-উপভাষার সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না। বলা যায়, বাংলার তুলনায় কম ছিল। তাই সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার ভাষা দাপ্তরিক পর্যায়ে আসতে পারেনি।

ভাষার ক্ষেত্রে তাহলে এই রাজনৈতিক দিকটি জরুরি?

শিশির ভট্টাচার্য্য : অবশ্যই। যে ভাষার যত বেশি স্বীকৃতি, সে ভাষা রাজনৈতিকভাবে তত সফল। রাজনৈতিকভাবে সফল বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে অসফল ব্যক্তিকে দাবিয়ে রাখতে চাইবেই। একইভাবে, যে ভাষার স্বীকৃতি বেশি, সে ভাষা অন্য ভাষাকে দাবিয়ে রাখতে চায়। ভাষা কিংবা ভাষী জনগোষ্ঠী মাত্রই রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেতে চায়, যদি তারও ক্ষমতা থাকে।
ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণে দুটি ভিন্ন ভাষা যখন পরস্পরের সংস্পর্শে আসে, তখন অধিক স্বীকৃতিবান ভাষাটিকে বলা যেতে পারে ‘উত্তমর্ণ’ বা সুপারস্ট্র্যাট ভাষা এবং তুলনামূলকভাবে কম স্বীকৃতিবান ভাষাটিকে বলা হয় ‘অধমর্ণ’ বা সাবস্ট্র্যাট ভাষা। উত্তমর্ণ ভাষার শব্দ অধমর্ণ ভাষায় ব্যবহৃত হয়, এর বিপরীতটা প্রায় কখনই হয় না। এর প্রমাণ, মধ্যযুগে উত্তমর্ণ ফার্সি থেকে প্রচুর শব্দ বাংলা শব্দকোষে প্রবেশ করেছে। ইংরেজ আমলের শুরু থেকেই প্রচুর ইংরেজি শব্দ বাংলা শব্দকোষে প্রবেশ করে আসছে। একইভাবে প্রচুর বাংলা শব্দও গারো কিংবা ককবরোক ভাষায় প্রবেশ করছে, কারণ বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতিতে বাংলা উত্তমর্ণ এবং গারো অধমর্ণ ভাষা।
অনেক রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা নয়Ñএমন একটি উত্তমর্ণ ভাষাকেও দাপ্তরিক ভাষা করে। উদাহরণ : ভারত বা নাইজেরিয়া যেখানে ইংরেজি ডি ফ্যাক্টো বা কাজে কর্মে দাপ্তরিক ভাষা। ভারতের ভাষা উর্দু পাকিস্তানের দাপ্তরিক ভাষা। এই ভাষা পরিস্থিতির নাম ‘এক্সোগ্লসিক’ বা ‘বহির্ভাষিক’ ভাষা পরিস্থিতি। অনেক রাষ্ট্র অর্ন্তভুক্ত কোনো একটি জাতির ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। এমন ভাষা পরিস্থিতির নাম ‘এন্ডোগ্লসিক’ বা ‘আন্তর্ভাষিক’ ভাষা পরিস্থিতি। বার্মায় এই ভাষা পরিস্থিতি বহাল আছেÑবর্মী, কারেন, রোহিঙ্গা, চীন ইত্যাদি জাতির নিজ নিজ ভাষা থাকা সত্ত্বেও বর্মী জাতির মাতৃভাষা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উপরোক্ত দুই পরিস্থিতিতে জাতিরাষ্ট্রের নাগরিকরা নিজের মাতৃভাষা নয়Ñএমন একটি ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে মেনে নেয়। প্রথমত, যখন তাদের নিজের ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা দাবি করার মতো ক্ষমতা থাকে না। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের ক্ষমতা ছিল মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা দাবি করার। সিন্ধি কিংবা বালুচদের সেই ক্ষমতা ছিল না। দ্বিতীয়ত, কোনো মাতৃভাষায় যদি লিপি না থাকে এবং মাতৃভাষায় যদি উন্নত সাহিত্য রচিত না হয়, সেক্ষেত্রেও সেই মাতৃভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি ওঠে না। বিশেষ ভাষায় সাহিত্য রচিত হওয়া সেই ভাষায় বিচিত্র ভাব প্রকাশের ক্ষমতার প্রমাণ বটে।
চট্টগ্রামের লোকসংখ্যা পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বেশি, অন্ততপক্ষে ইসরায়েলের চেয়ে বেশি; কিন্তু চট্টগ্রামীরা নিজেদের মাতৃভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি কখনো করেনি, কারণ তারা বিশ্বাসই করে না যে চট্টগ্রামী ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হবার উপযুক্ত। পক্ষান্তরে একটি কৃত্রিম ভাষা আধুনিক হিব্রুকে ইহুদিরা ইসরায়েলের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আধুনিক হিব্রু কৃত্রিম ভাষা, কারণ ইদ্দিশ বাক্যবিন্যাসের ওপর হিব্রু শব্দ বসিয়ে প্রথমে একটি পিজিন ভাষা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর পর একাধিক প্রজন্ম যখন এই পিজিন মাতৃভাষা হিসেবে শিখেছে, তখন সেই ভাষা ক্রেওল-এ বা স্বাভাবিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। বার্মার বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিবেশের কারণে রোহিঙ্গারা মনে করে যে তাদের মাতৃভাষা এবং মূলত চট্টগ্রামীর একটি উপভাষা রোহিঙ্গা বার্মার অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হওয়া উচিত।
যে সমাজে একটি উত্তমর্ণ এবং একটি অধমর্ণ ভাষা সহাবস্থান করে, সে সমাজের লোকজন চায়, উত্তমর্ণ ভাষাটিই শিক্ষার মাধ্যম হোক, সব বিষয়ে না হলেও অন্তত কিছু কিছু বিষয়ে। এই মানসিকতা পৃথিবীর সর্বত্র দেখা যায়। বাংলাদেশে অনেকেই একটি বহির্ভাষিক বা এক্সোগ্লসিক ভাষা পরিস্থিতি চায়, অর্থাৎ ইংরেজিকে তারা দাপ্তরিক ভাষা করার পক্ষে। ভারতের ভাষা উর্দুকে দাপ্তরিক ভাষা করে পাকিস্তানিরাও অনুরূপ একটি ভাষা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আগেই বলেছি, যে ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হবে, সে ভাষা ব্যবহারকারীরা রাষ্ট্রের বহুবিধ সুবিধা ভোগ করবে। বাংলাদেশের সুবিধাভোগী শ্রেণি ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা করার পক্ষে (ঠিক যেভাবে পাকিস্তানের সুবিধাভোগী শ্রেণি উর্দু বা ইংরেজির পক্ষে ছিল), কারণ প্রথমত, তারা নিজেরা ইংরেজি জানে বলে ‘ভাবে’ এবং বাংলাকে তারা ছোটলোকের ভাষা মনে করে। ইংরেজি যদি দাপ্তরিক ভাষা হয়, তবে তারা এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরা রাষ্ট্রের সব সুবিধা ভোগ করতে পারবে, কারণ দেশের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কখনই ইংরেজি শিখে উঠতে পারবে না কিংবা শিখতে পারলেও ভাষিক যোগ্যতার বিচারে সুবিধাভোগী শ্রেণির তুলনায় পিছিয়ে থাকবে। এ ছাড়া বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা করার পেছনে যে খরচ ও বিনিয়োগ আছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী শ্রেণি সেই খরচ ও বিনিয়োগ করতে রাজি নয়। এই খরচ ও বিনিয়োগ না করার অন্যতম কারণ, এর ফলে সুবিধাভোগী শ্রেণি নয়, বরং তাদের চোখে যারা ছোটলোক, তারা উপকৃত হবে। পঞ্চাশের দশকের পাকিস্তানে সমজাতীয় ভাষা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল এবং এমন এক পরিস্থিতিতেই ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে পাকিস্তানপন্থিরা বাংলা ভাষার সঙ্গে শত্রুতা করত প্রকাশ্যে, ঘোষণা দিয়ে। একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দিবস। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!’Ñএই দিবস হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষার অধিকার নিয়ে তো কারও দ্বিমত নেই। মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হবে কি না, কিংবা মাতৃভাষাকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়া হবে কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন। যে ভাষার সব স্বীকৃতি আছে সে ভাষা সসম্মানে দীর্ঘজীবী হবার কথা। যে ভাষার একটি স্বীকৃতিও নেই, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সে ভাষার জীবন-সংকট।

অর্থাৎ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাংলাকে তুলনামূলকভাবে ইংরেজির সঙ্গে এক ধরনের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় বাংলা ভাষার জীবন-সংকটের বিষয়টি রয়েছে?

শিশির ভট্টাচার্য্য : দেশের সিংহভাগ জনগণকে কখনই এতটা ইংরেজি শেখানো যাবে না যে ইংরেজিকে একটি কার্যকর ও গণমুখী দাপ্তরিক ভাষা করে তোলা সম্ভব হবে। ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা করার মানে হচ্ছে, ভাষাটিকে শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের মাধ্যম করে তোলা। দ্বিতীয়ত, ইংরেজিনির্ভর প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা হবে একান্তভাবে জনবিমুখ। কারণ প্রথমত, জনগণ যে ভাষা জানে না, সেই ভাষায় তাকে সেবা দেয়া মানে জনগণের অর্থের অপচয় এবং দ্বিতীয়ত, অজানা একটি ভাষায় সুবিচারও আশা করা যায় না। ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা করার প্রচেষ্টা যদি কমবেশি সফল হয়, তবে তার ফলে কার্যকর ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যাহত হবে। শিক্ষা ব্যাহত হলে ব্যাহত হবে টেকসই উন্নয়ন। উন্নয়ন ব্যাহত হলে যে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে দেশের বাইরে গিয়ে জীবিকা অর্জন, উচ্চশিক্ষা অর্জনের মতো কাজগুলোও কঠিন হয়ে যাবে। আর এজন্যই আমরা বলছি, ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্ত বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রমাণিত হবে।

বাংলা ভাষা বিষয়ক আশঙ্কা নিয়ে আপনার একটি প্রবন্ধ রয়েছে, ‘বাংলা কি আদৌ বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা?’। এই প্রবন্ধে বাংলা ভাষাকে নিয়ে আপনার যে আশঙ্কা রয়েছে, সেটি নিয়ে যদি বলেন।

শিশির ভট্টাচার্য্য : এ প্রবন্ধে আমি আসলে প্রথাগত ব্যাকরণের বাইরের কিছু বিষয় আলোচনা করতে চেয়েছি। এতক্ষণ যা বলছিলাম, ব্যাকরণ আসলে ভাষার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকটিকে নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করে না। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকÑকোনো ভাষার এই তিন ধরনের প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা যেতে পারে। একটি ভাষা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার অন্যতম লক্ষণ সেই ভাষায় সাহিত্য রচিত হওয়া। মধ্যযুগেই বাংলার সামাজিক প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রে প্রচলিত একাধিক ভাষার মধ্যে বিশেষ একটি ভাষা যদি দাপ্তরিক বা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে সেই ভাষাটির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা অর্জিত হয়। ৪৮Ñ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল বাংলা ভাষার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা। ‘বাংলা কি আদৌ বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা?’Ñভাষা আন্দোলনের প্রায় সত্তর বছর পরেও এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক।
আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের পছন্দের ভাষা বাংলা নয়। এক রাজা, তার দুই রানি। সুয়োরানি ও দুয়োরানি। ইংরেজি সুয়োরানি, আর বাংলা দুয়োরানি! রূপকথায় কী হয়? সুয়োরানি রাজার সঙ্গে শোয়, দুয়োরানিকে দুয়ো দিয়ে নির্বাসনে পাঠানো হয়! কোনো ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়ে উঠতে হলে ভাষাটিকে সর্বস্তরের আদালত ও ব্যবসায় সমাজজীবনের এই চতুরঙ্গের একমাত্র ভাষা হয়ে উঠতে হবে। ফ্রান্স, জার্মানি বা জাপানে যথাক্রমে ফরাসি, জার্মান ও জাপানি ভাষা উপরোক্ত চতুরঙ্গের একমাত্র ভাষা। এসব দেশে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষার একচেটিয়া অধিকার। দ্বিতীয় কোনো ভাষাকে সেখানে রাষ্ট্রভাষার সাথে প্রতিযোগিতা করতে দেয়া হয় না। রাষ্ট্রভাষার দাবির সঙ্গে শুধু আবেগ আর রক্ত নয়, কিছু জাতীয় স্বার্থও মিশ্রিত ছিল। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়া বা না হওয়ার ওপর বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। বাংলা যদি শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম না হয়, তবে কোটি কোটি বাংলাভাষীকে শতভাগ শিক্ষিত করে তোলা যাবে না। কোনো অর্ধশিক্ষিত বা মূর্খ জনগোষ্ঠীর পক্ষে উন্নত জাতি গঠন করা সম্ভব নয়। শিক্ষার একাধিক মাধ্যম থাকলে (যেমন, বাংলা ও ইংরেজি) জাতির শিক্ষিত অংশের মধ্যে বৈষম্য এবং কালক্রমে বিভক্তি সৃষ্টি হওয়া অবশ্যম্ভাবী, যা রাষ্ট্রজাতি গঠনে সহায়ক নয়।

অর্থাৎ বাংলা ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা।

শিশির ভট্টাচার্য্য : হ্যাঁ। অন্তত এমনভাবে ব্যাখ্যা করলে ভাষার বর্তমান অস্বস্তিকর সমস্যাটা ধরা যায়। স্বাধীনতার পর এখনও আমরা বাংলায় রায় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারিনি। এটি অনেক বড় একটি সমস্যা। শিক্ষার প্রধান বাহন হিসেবে বাংলাই প্রধান মাধ্যম নয়। অথচ বাংলার বিকাশের জন্য বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা ইনস্টিটিউটসহ নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ভাষার সৃজনশীল দিক নিয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু আমি অতীতেও বেশ কয়েকবার বলেছি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কাজটি সম্ভব হয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব এমনভাবে ভাষা সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে যে এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে কাজ করার সুযোগ কিছুটা ধীর হয়ে ওঠে। তবে এই সমস্যা এড়ানো সম্ভব যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো হয়। আমরা বলি, কাজ হয় না। অভিযোগ করি, দায়িত্ববানরা কাজ করতে চান না। কিন্তু সমস্যা হলো, যার যা কাজ তা করতে দেওয়া হয় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক কিছুই হয় না।
একটা উদাহরণ দেই। বাংলা একাডেমি তো শুধু বইমেলার আয়োজন করবে না। বাংলা একাডেমিকে সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার কাজটি করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের যে বিভাগগুলো আছে সেগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার রচনাগুলোর সম্ভার বাড়াতে হবে। বইমেলার আয়োজনের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি প্রকাশক সমিতিকে যদি সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে বইমেলা প্রাণ ফিরে পাবে। কিন্তু এমনটি তো হয় না। তাই বছর জুড়ে আসলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কী করে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে হয়রান হতে হয় আমাদের।

ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাকরণের গুরুত্ব উপলব্ধির ক্ষেত্রে কি মানসম্পন্ন বইয়ের অভাবকে কিছুটা দায়ী করা যায় না? কারণ আমাদের দেশে মানসম্পন্ন ব্যাকরণ বই বেশ কম। এ নিয়ে অল্প কিছু প্রকাশনীই কাজ করে। এ ক্ষেত্রে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

শিশির ভট্টাচার্য্য : এখানেও এক ধরনের সমস্যা রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই সরকারি। আর দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক কাজই সঠিক সময়ে হয় না। আমরা দেখছি, বাংলা একাডেমি বিভিন্ন আয়োজন করে। কিন্তু সেগুলো আয়োজনসর্বস্ব। ভাষাকে নিয়ে তাদের কাজের পরিসর কম। প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমশক্তি ব্যয় হচ্ছে এসব অনুষ্ঠানে। তাদের দায়িত্ব ভাষা নিয়ে কাজ করা। যেমন বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার যত ভাষা আছে, সেগুলোর ব্যাকরণ এবং অভিধান তৈরি করতে হবে। বিদেশি সাহিত্যের ভালো বাংলা অনুবাদ হতে হবে। উন্নত অভিধান বানাতে হবে এবং কাজগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যখন সাধারণ পাঠকের কাছে তা পৌঁছুবে তখন বিভিন্ন প্রকাশনীও এ ধরনের বই প্রকাশের আগ্রহ পাবে। একটি বই প্রকাশের কাজটি যথেষ্ট কঠিন। শুধু লেখাতেই তা শেষ নয়। এর পেছনে সম্পাদনা, ছাপা, প্রচ্ছদ, বইয়ের মেকাপও জড়িত। কিন্তু কোনো বিষয়ভিত্তিক লেখার প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার ছাড়া এসব প্রকল্প প্রকাশনীগুলোর কাছে বিলাসিতাই বলে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক।

বাংলা ভাষা একটি জীবন্ত ভাষা। এই ভাষার বিকাশের জন্য তরুণ প্রজন্ম ও সাহিত্য অঙ্গনের প্রতি
আপনার পরামর্শ?

শিশির ভট্টাচার্য্য : ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা ভাষা নিয়ে মৌসুমি গণ-হাহুতাশের একটি বিষয় হচ্ছে ‘বাংরেজি’। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই এই ধরনের ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা অনেক বেশি থাকে। গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা এই নাগরিক উপভাষার উচ্চারণ অনেকটা ইংরেজির মতো এবং শব্দকোষ ইংরেজি শব্দে ঠাঁসা। বাংলা বাক্যবিন্যাসে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে এই উপভাষা বলা হয়। বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোতে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম সাধারণত বাংরেজিতে কথা বলে।
যেকোনো ভাষা হচ্ছে একটি যোগাযোগ মাধ্যম। এই মাধ্যমটি ব্যবহারে কেউ কম, কেউ বা তুলনামূলকভাবে বেশি পারঙ্গম। বড় হয়ে উঠতে উঠতে বেশিরভাগ শিশু যে ভাষাটি শেখে অথবা যে ভাষাতে তারা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে, সেই ভাষাটি তারা সাবলীলভাবে ব্যবহার করতে পারে। এই ভাষাটিতে শিশুর ভালো রকম দখল থাকে এবং শোনামাত্র শিশু সাধারণত বলে দিতে পারে সে ভাষার কোনো শব্দ শুদ্ধভাবে উচ্চারিত হচ্ছে কি না বা কোনো বাক্য ত্রুটিপূর্ণভাবে গঠিত হয়েছে কি না। একবার প্রথম ভাষাটি অর্জিত হয়ে যাবার পর মানবসন্তান যত ভাষাই শিখুক, দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা বলার সময় প্রথম অর্জিত ভাষাটির ধ্বনিতত্ত্বের প্রভাব সাধারণত এড়াতে পারে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুর মাতাপিতা এবং শিশু একই ভাষাভাষী হওয়ার কারণে শিশুর প্রথম অর্জিত ভাষাটিকে ‘মাতৃভাষা’ বলার একটা রেওয়াজ চালু হয়ে গিয়েছে।
নতুন প্রজন্ম ইংরেজির ঢঙেই কথা বলছে। তবে এটিকে তাদের দোষ বলা যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থায় নীতিনির্ধারকদের অপরিণামদর্শিতাই এখানে এই সমস্যা তৈরি করেছে। তবে সম্প্রতি অনেকেই অনুবাদচর্চার দিকে ঝুঁকছেন। আবার অনেকে একাধিক ভাষাও শিখছেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। কারণ, একাধিক ভাষা শেখার মাধ্যমে ওই ভাষার সাহিত্যকর্মের সঙ্গেও আত্মিক সংযোগ আরও নিবিড় হয়। এই ইতিবাচকতাটুকুকে আমাদের জন্য আশা হিসেবে ভাবতে হবে। এই সময়ে ভাষাকে ঘিরে আমাদের যে অস্বস্তি, তা দূর করা সম্ভব যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা বাংলাকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিতে পারব। কাজটি কঠিন, সময়সাপেক্ষ। কিন্তু যেহেতু তরুণ প্রজন্ম, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, তাই আশাবাদী হতেই হয়।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Mehedi Hasan

Muzharul Islam

Md.-Abdur-Razzak

Mahrukh-Mohiuddin-2