Homeইন্টারভিউথ্রিলারও সাহিত্য; তবে এটার ফাংশন আলাদা, গ্রামার আলাদা

থ্রিলারও সাহিত্য; তবে এটার ফাংশন আলাদা, গ্রামার আলাদা

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন একাধারে অনুবাদক, লেখক এবং প্রকাশক। তবে বাংলাদেশে মৌলিক থ্রিলারের পথিকৃৎ বলেই তিনি সমধিক পরিচিত। মূলত ‘নেমেসিস’ নামক মৌলিক থ্রিলারের মাধ্যমে তিনি থ্রিলার পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। এখন পর্যন্ত ১১টি মৌলিক থ্রিলার লেখার পাশাপাশি ২৬টি বইয়ের অনুবাদও করেছেন। তাঁর লেখা থ্রিলার অবলম্বনে নির্মিত হচ্ছে ওয়েব সিরিজও। ব্যস্ত এই রুটিনের মধ্যে সাড়ে ৩ দিনের পত্রিকার প্রতিনিধি মার্যিউর রহমান চৌধুরীর মুখোমুখি হয়েছেন এ লেখক

শুরুতে জেনে নিতে চাই আসলে কেমন আছেন। কারণ একটা নতুন সময় চলছে। আর এই নতুন সময়ে ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে সেটাই জরুরি হয়ে যায়।

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : বেশ ভালো আছি। বরাবরের মতোই লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের সময়টাই এমন যে এখন অনেক কিছু খারাপ আছে। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে আমি বরাবরই ভালো থাকার চেষ্টা করি। এই ভালোলাগার জায়গা অবশ্যই লেখালেখি। এটা একটা পরিচয়। এই পরিচয়ের বিষয়ে আমি ফেসবুকেও যেমন সরব তেমনি সাক্ষাৎকারে বেশ লাজুক।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন করতে হয়। আপনাকে আমরা বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ থ্রিলার লেখক হিসেবে চিনি। আপনার কেন মনে হলো আপনি থ্রিলার নিয়ে কাজ করবেন?

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে আসলে অনেক কিছুই বলা যায়। এগুলো নিয়ে অনেকবার বলেছি। আমি আমার মতো করে কাজ করেছি। করেছি সচেতনভাবে। তবে শুরুটা যে একদম সচেতন ছিল এমনটি আমি বলব না। কারণ সত্যিটা হলো, আমি সচেতনভাবে কিছু না ভেবেই থ্রিলার জনরা নিয়ে লিখতে শুরু করি। এক্ষেত্রে ভালোলাগার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। আমি যখন থ্রিলার লিখতে শুরু করি, তখন হয়তো অবচেতনে অনেক কিছু ছিলÑকীভাবে বলা যায়…আমার ভালোলাগার একটা বিষয় ছিল। মানে এই ধরনের গল্প লেখার মানসিকতা আমার ছিল। আবার অভিজ্ঞতাও ছিল। যখন প্রথম লেখা শুরু করি, তখন দেশে মৌলিক থ্রিলার ছিলই না বলা চলে। মানে কাঠামোগতভাবে দেশে যে থ্রিলার ছিল সেগুলো আসলে বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা হতো। প্রেক্ষাপটটা একদমই বিদেশি ছিল। কিন্তু দেশীয় আবহ দেওয়া হতো। বিষয়টা আমাকে সবসময়ই একটা মৌলিক জায়গা থেকে ভাবাত। ভাবাত, কারণ পৃথিবীর সব দেশেই থ্রিলার লেখা হয়। একেকটা দেশে একেকভাবে থ্রিলারকে লেখা হয়। ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশনেও তাই থ্রিলারের এই সাংস্কৃতিক আবহ চলে আসে। আমাদের সংস্কৃতিরও তো এই দিকগুলো আছে। তাহলে আমাদের কেন ছায়া অবলম্বন করে লিখতে হবে? আমার মনে আছে, বেশ নামকরা একজন থ্রিলার লেখক বলতেন যে, বাংলাদেশে আসলে মৌলিক কোনো থ্রিলার লেখক নেই। তিনি বলতে চেয়েছেন, থ্রিলার লেখার মতো লোকই নেই। বিষয়টাকে আমি জেদ হিসেবে নিয়েছি। আবার এটা এক ধরনের অনুপ্রেরণাও। আমি যে লিখতে পারি, সেটা দেখিয়ে দেয়ার জেদ আর কি।

এই মৌলিক থ্রিলার লেখার পথটা নিশ্চয় মসৃণ ছিল না?

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : ছিল না তো অবশ্যই। একটু আগেও তো বললাম। বেশ নামকরা অনেকেই বলতেন দেশে মৌলিক থ্রিলার লেখার মতো লোক নেই। এই প্রতিক্রিয়া কারা দেখিয়েছেন সেটি পাঠক বা থ্রিলারের একনিষ্ঠ ভক্তরা কিন্তু জানেন। এখন খোলাসা করে বলার কিছু নেই। যখনই কেউ শুনত মৌলিক থ্রিলার, তখন এক ধরনের গাত্রদাহ হতো। আমাদের দেশে আবার কিছু পাঠক নিজেদের সিরিয়াস সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক ভাবেন। তারা থ্রিলারকে সাহিত্যই ভাবেন না। এখনও যে অনেকে এভাবে দেখেন না, এমনটি নয়। তারা বেশ ভালোভাবেই দেখেন। থ্রিলারও সাহিত্য; তবে এটার ফাংশন আলাদা, গ্রামার আলাদা। এখন সমালোচনা আসবেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, যে সমালোচনাগুলো আসে এগুলো পপুলার কালচার থেকে আসে। মানে ফেসবুক আর ইউটিউব থেকে আসে। অনেক সময় পেশাদার জায়গা থেকে আসে না। পেশাদার জায়গা থেকে যেহেতু আসে না, তাই আমি সমালোচনার জবাব দেই না। এই বিষয়গুলোকে আমি বরাবরই ভার্চুয়াল জগতের বলেই ভাবতে পছন্দ করি। থ্রিলারের মতোই অ্যাকচুয়াল কিছু এগুলো নয়। আমার কাজ লিখে যাওয়া এবং মৌলিক থ্রিলারে বৈচিত্র্য আনা। সেই কাজটাতেই মনোযোগ দিতে চাই। কোনো লেখকের যাত্রাই আসলে মসৃণ না। কিন্তু তার কাজের ভাবনার জায়গাটি থেকে সরে গেলে পথচ্যুত হয়ে যাবে। নতুন কিছু আর আসবে না।

আচ্ছা। আপনি তাহলে লেখকসত্তাটার বিষয়ে আসলে অবচেতনে অনেক সচেতন। কিন্তু অবচেতনের প্রসঙ্গই যখন এলো, তখন ধরে নিতে হয় যে শৈশবের কোনো একটা ঘটনা আপনাকে লেখক হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সেটা কি আমাদের সাড়ে ৩ দিনের পত্রিকার পাঠকদের জানাবেন?

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : খুব কঠিন প্রশ্ন। নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা এখানে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে কি না আমি জানি না। অবচেতনের প্রসঙ্গ এলে আসলে বলা কঠিন। আমি প্রচুর বই পড়তাম। পড়তে পড়তেই আসলে একটা সময় আমার মধ্যে গল্প লেখার ইচ্ছে জেগেছিল। তবে আমি একটা জিনিস বুঝেছি। লেখা শুরুর আগে আমাকে অনেক পড়তে হবে। মানে এখন যতটুকু জানি, তার চেয়ে আরও বেশি পড়তে হবে। এটা একটা চর্চার বিষয়। এই চর্চাটা একেবারেই নিঃসঙ্গ একটি কাজ। কাজটি করতে হয় নিভৃতে। চর্চার জায়গাটা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু কীভাবে আসলে আমি চর্চা করব এ বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। তখন কিছু ছোটগল্প লেখার চেষ্টা করি। সেগুলো বার বার পড়ে লেখার দুর্বলতা খুঁজতাম, ঠিকঠাক করতাম। পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ করেও একটা প্র্যাকটিস হচ্ছিল আমার। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাংবাদিকতা করার যে অভিজ্ঞতা, সেটাও কাজে দিয়েছে। শুরুতেই বলেছি, এটা নিঃসঙ্গ চর্চার বিষয়। এটিকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আসলেই নেই।

আমরা দেখেছি আপনার লেখায় সমসাময়িক রাজনীতি ও এর অন্ধকার দিকগুলো বারবার উঠে আসে। মানে আপনার থ্রিলারের মধ্যে বিষয়গুলো আসে। তার মানে এ বিষয়গুলোও আপনি সচেতনভাবে উপস্থাপন করেন। আপনার লেখার সচেতন পাঠকরাও কিন্তু এ দিকটা নিয়ে আলোচনা করেন। আসলেই কি তাই? আমাদের পাঠকদের উদ্দেশে যদি বিষয়টি তুলে ধরেন।

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : বেশ স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ। রাজনীতি আসলে বাতাসের মতোই। সোজা ভাষায়, আমার নিঃশ্বাসের সঙ্গে যাওয়া অক্সিজেনের মতো। কেউ চাক বা না চাক, তাকে এই বাতাস নিতে হয়। কিন্তু যখন বাতাসে অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান জড়ো হতে শুরু করে, তখন তা দূষণ ঘটায়। নির্মল অক্সিজেনটা থাকে না। দূষণ ঘটলে তা সবার জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। রাজনীতির ক্ষেত্রে আমার এই বিশ্বাসটা সবসময়ই ছিল। বলা যেতে পারে, কলেজজীবন থেকেই। চোখের সামনে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান দেখেছি। ওই সময় তা আমার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও বটে। রাজনীতি আমার সমাজ ও চারপাশে মিশে আছে।
আমি বিশ্বাস করি, কোনো লেখক যদি তার সত্যিকারের সমাজ এবং চারপাশকে নিয়ে না লেখে, তাহলে সে অসৎ লেখক। একটু মোলায়েম সুরে বললে ‘আলগা লেখক’ বলে এই গোষ্ঠীকে আমি চিহ্নিত করি। এটা একান্তই আমার দৃষ্টিকোণ। কারও দ্বিমত থাকতে পারে। আমার দৃষ্টিতে ‘আলগা’ বলতে আমি বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্নতাকে বোঝাচ্ছি। এই শব্দটাকে আমি আমার অর্থ দিয়েছি আবার আভিধানিকভাবেও দেখেছি অর্থটা মেলে। তাই অভিধানের ওই সঞ্জীবনী শক্তিটাকে ঠিকই নিয়েছি। আমার মতো নিয়েছি। আমি দেখেছি, আমাদের দেশে এ ধরনের ‘আলগা’ মানুষ দিয়ে ভরা। যেখানে তাকাবেন, ‘আলগা’ মানুষ দেখতে পাবেন। জনমানুষ কিংবা সমকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা বসবাস করে। তাদের চিন্তা-ভাবনা এবং কর্মকাণ্ডও ভীষণভাবে ‘আলগা’। এ বিষয়ে আমি সচেতন বলেই হয়তো আমার লেখায় সমসাময়িক রাজনীতি ও এর অন্ধকার দিকগুলো বারবার উঠে আসে। সচেতন পাঠকরা বিষয়টা ধরতে পারেন। তারা তাদের মতো করে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু দিনশেষে আমি যা লেখি, তা থ্রিলার হয়ে উঠল কি না এটাই মুখ্য বিষয়। থ্রিলার লিখলে তাতে রাজনীতি বা বর্তমান আসবে না এমন ধারণা থেকে বের হওয়া জরুরি। পুরাণ নিয়ে তো চর্চা হয়। পুরাণকে অবলম্বন করে থ্রিলার হতে পারে। কিন্তু সেটাকে বর্তমানের সাথে আমরা এমনভাবে সংযোগ ঘটাতে চাই যাতে সেটিতে আর অতীতের ছায়া না থাকে। এখানেই মৌলিকত্ব এবং সৃষ্টির সুখ।

চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর আমরা দেখেছি বইকে কেন্দ্র করে আবারও জাগতে শুরু করেছে সব অঙ্গন। মানে সাহিত্য অঙ্গনে এক ধরনের উৎসাহ দেখা দিতে শুরু করেছে। এবারের বইমেলা আসলে একদমই নতুন বা ভিন্ন এক সময়ের মেজাজ নিয়ে এসেছে। বিষয়টি থ্রিলার সাহিত্যকেও কি প্রভাবিত করছে?

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : আমার লেখক জীবনের সূচনাকালটা যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওই সময়টাকে আমি ফ্যাসিজমের সময়ই বলি। বলা যেতে পারে, আবারও যখন ফ্যাসিজম নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে, তার সূচনালগ্নে আমি লেখালেখি শুরু করেছি। ফ্যাসিস্ট যে এলিমেন্টগুলো নিয়ে এখন আলোচনা হয়, সেগুলোকে প্রচ্ছন্নভাবে থ্রিলারে এনেছি কখনও কখনও। আবার কখনও কখনও সরাসরি টেনে এনেছি। আপনার পত্রিকার জায়গার অভাবের কথা বিবেচনা করে বই ধরে ধরে সব বলতে পারছি না আসলে। আমার কিন্তু একটা পরিচয়ই আপনি বলছেন, আমি মৌলিক থ্রিলার লেখক। আমি একজন অনুবাদক, প্রকাশক, স্ক্রিপ্ট লেখকও। আবার সাংবাদিকতার সঙ্গেও আমার যোগ রয়েছে। মানে আমার এই কাজগুলো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। আমি লক্ষ করেছি, আমার পরে যে থ্রিলার লেখকরা এসেছেন, তারা সবাই এই ফ্যাসিজম বা রাজনৈতিক সচেতনতাকে ধারণ করেই লিখেছেন। একই কাজ তো ওয়েস্টার্নের লেখকরাও করেন। হরর জনরাতেও কি তা নেই? আছে অবশ্যই। তবে থ্রিলারের গ্রামারটা আলাদা। এটার পাঠরুচি এবং পড়ার পর মানসিক অনুভূতিও আসলে ভিন্নরকম। তাই ওই ব্যাকরণটা মেনেই ফ্যাসিজম কিংবা রাজনীতিকে উপস্থাপন করতে হয়। আমি দেখেছি, যারাই বিগত সময়ে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তারা সবাই রাজনীতির বিষয়টা ভালোভাবে বুঝেছেন। তবে থ্রিলার লেখক এবং কার্টুনিস্টরা এক্ষেত্রে বেশি সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। তাই ওই চর্চা ঠিকই ছিল। নতুন এই সময়েও অনেকের মধ্যে এই সচেতনতা আছে। তবে এখন এই মুহূর্তে আসলে থ্রিলার লেখকরা কীভাবে তাদের যাত্রাকে আরও বেগবান করবেন বা যাপিত সময়টা আমাদের থ্রিলার সাহিত্যকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, আমি জানি না। জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও আমরা এক ধরনের অস্বস্তিতে আছি। সেটা হয়তো আসবে। কিন্তু এটা একটা অংশ মাত্র। কোনো থ্রিলার লেখক যদি চান, এটা নিয়ে লিখবেন। এটা তার সচেতনতা, তার সৃষ্টির অনুভূতির জায়গা থেকে আসবে। আমরা চাইব, চর্চার জায়গাটা যেন স্বচ্ছ থাকে। পটপরিবর্তন হলেও যেন লেখা না থামে। থ্রিলার জনরার লেখকরা বরাবরই সাহসী। আগামীতেও লেখকদের মধ্যে এই সাহসটুকু থাকবে বলে আমার আস্থা রয়েছে। এই আস্থাটা ধরে রাখতে চাই।

আপনার বই নিয়ে আসলে আলাপটা টানা হলো না। বই ধরে ধরে আগানোর চেয়ে মনে হলো বরং আপনার সৃষ্টির উন্মাদনা নিয়েই ভাবি। আপনার মৌলিক থ্রিলারের কিন্তু ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশনও আছে। আপনার গল্প নিয়ে বেশ কয়েকটি ওয়েব সিরিজ নির্মাণ হয়েছে। এখন থ্রিলার লেখকদের মধ্যে ওয়েব সিরিজের জন্য গল্প লেখার আগ্রহ বাড়ছে। সর্বশেষ পণ্যটিকে আমরা ভিজ্যুয়াল হিসেবে দেখলেও শুরুতে কিন্তু টেক্সটই হচ্ছে। এই দিকটাকে কীভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : এখন পর্যন্ত আমার লেখা ৪টা গল্প-উপন্যাস ওয়েব সিরিজ হিসেবে পর্দায় এসেছে। চাইলে আমি আরো অনেক গল্পই দিতে পারতাম। কিন্তু একটা পর্যায়ে মনে হয়েছে, এখানকার নির্মাতারা মানে বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিচালক এখনও থ্রিলার জনরাটা বোঝেন না। অন্তত, পর্দায় কীভাবে আনতে হবে সেই কলাকৌশল রপ্ত করতে পারেননি। হতে পারে তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা ধারণা এখানে কম। আবার হতে পারে কাঠামোগতভাবে তারা থ্রিলার নির্মাণের সুযোগ পান না। যেটাই হোক, আমি একটু সময় নিচ্ছি। ভবিষ্যতে হয়তো আমার আরো কিছু গল্প ওয়েব-সিনেমা হিসেবে আসতে পারে।
এখন মূল প্রশ্নটায় ফেরা যাক। তরুণ থ্রিলার লেখকরা ওয়েব সিরিজের জন্য টেক্সট তৈরি করছেন। মানে স্ক্রিপ্ট বানাচ্ছেন। এটাকে আমি ইতিবাচক ভাবি। আমি দেখেছি, থ্রিলার সাহিত্যে জেনুইন লেখক ও চিত্রনাট্যকারÑএ দুটোরই অভাব আছে। এক্ষেত্রে প্রকাশনীগুলোর দায়ও যে নেই তা কিন্তু না। তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও যে আছে তা আমি প্রকাশক হিসেবে অনুধাবন করি। এসব এখন আর বলতে ইচ্ছে করছে না। একপেশে মনে হতে পারে। আমি যেটা বলতে চাই, এই যে চর্চার জায়গা বাড়ছে এটার ফলে সাহিত্য ও পারফর্ম্যান্স আর্টÑএ দুটোই কিন্তু সমৃদ্ধ হবে। এই সম্ভাবনাকে ইতিবাচক না ভাবার কারণ দেখি না।

বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও আপনি তুমুল জনপ্রিয়। মানে ওপার বাংলায়ও আপনাকে নিয়ে রয়েছে ক্রেজ। এটা আমাদের থ্রিলার সাহিত্যকেও অনন্যভাবে উপস্থাপন করছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে অনুভব করেন?

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : জনপ্রিয়তাকে তো খারাপ বলার উপায় নেই। এটা সবারই আরাধ্য। তবে এটাকে আবার বড় করেও দেখার কিছু নেই। জনপ্রিয়তা লেখককে আত্মবিশ্বাস দেয়, নিজের মতো করে লিখতে উৎসাহ দেয়। একটা নিশ্চিন্ত জীবনের সম্ভাবনা তৈরি করে। এটা আবার একই সাথে সঙ্কীর্ণমনা এবং দুর্বল চরিত্রের লেখককে আত্মম্ভরী করে তোলে, বাজারের চাহিদামতো লিখতে প্রলুব্ধ করে। ফলে জনপ্রিয়তাকে আমি সার্কাসের দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া মনে করিÑচূড়ান্ত ভারসাম্য বজায় রেখে পথটা চলতে হয়। নইলে ধপাস! মানে পতন অনিবার্য। আমি বিশ্বাস করি, লেখক কোনো সেলিব্রেটি না। কারণ সে পারফর্ম করে নাÑনিঃসঙ্গ শেরপার মতো লিখে যায়। এক্ষেত্রেও জনপ্রিয়তা ক্ষতিকর হতে পারে। তাই জনপ্রিয়তাকে পরিপক্বতার সঙ্গে নিলেই ভালো। এটা আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ।

থ্রিলার লেখার প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। যারা থ্রিলার লিখতে চায়, তাদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ আসলে কী?

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : হা হা হা। আমি কিন্তু সেই চিরাচরিত পরামর্শই দেব। প্রচুর পড়তে হবে। তবে সাধারণ পাঠকের মতো নয়। কমন রিডার কিন্তু হলে চলবে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে, গভীরভাবে লেখাগুলো পড়তে হবে। একজন লেখক কীভাবে চরিত্র নির্মাণ করেন, বর্ণনা করেন, শব্দ-বাক্য নিয়ে খেলেন…এগুলো পর্যবেক্ষণে না থাকলে শুধু বই পড়ে লেখক হওয়া যাবে না। তবে এক্ষেত্রে আমার নিজস্ব একটা মতামতও আছে। সব লেখকেরই তীব্র কল্পনাশক্তি থাকা জরুরি। আমাদের মধ্যে একটা বাতিক ঢুকে গেছে। কোনো কিছু লিখেই সেটাকে বই আকারে ছেপে ফেলার। এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। একটা বই লেখার পর তার সম্পাদনা করতে হয়। প্রচ্ছদ, বইয়ের বাঁধাই থেকে শুরু করে বিপণনের মতো একটি ক্লান্তিকর বিষয়ও প্রকাশনা খাতকে সামলাতে হয়। লিখলেই তা ছাপিয়ে ফেলতে হবে, এমন ভাবনা আসলে হেলদি না। তবে লেখার সম্ভাবনাকে যাচাই করা, পরখ করার কাজটিও তো করতে হয়। এটা সমন্বয়ের বিষয়। এমনি এমনি হয় না। সম্ভব না। লেখালেখি অনেক কঠিন কাজ। আজ থ্রিলার লেখকই হই বা সিরিয়াস ধারার সাহিত্যিক হই, অসীম ধৈর্য নিয়ে চর্চা করতে হবে। না হলে সময়ই আমাকে ভুলে যাবে। লম্বা একটা সময় পর আসলে লেখালেখির ফল পাওয়া যায়। থ্রিলারের বিষয়বস্তু প্রতিনিয়ত আপডেট হয়। তার মানে এই না যে এটা কালোত্তীর্ণ হতে পারবে না। এমন ধারণাই বরং ভুল। সৃষ্টির একটা আলাদা সৌন্দর্য থাকে। এটি সবসময় নিশ্চিত হয় যখন যিনি লিখছেন তার মধ্যে স্বচ্ছতা থাকে।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular