Homeইন্টারভিউএই জনরার আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হবে না

এই জনরার আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হবে না

হরর এবং থ্রিলার অনুরাগী পাঠকদের কাছে একটি প্রিয় ও সুপরিচিত নাম অনীশ দাস অপু; জন্ম ৫ ডিসেম্বর, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর এই লেখক-অনুবাদক ছাত্রজীবনেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এ পর্যন্ত ৫০টির বেশি প্রকাশনা সংস্থা থেকে সাড়ে চার শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। বেশিরভাগই হরর এবং থ্রিলার। তবে তিনি অসংখ্য ক্ল্যাসিক, নন-ফিকশন এবং সায়েন্স ফিকশনও অনুবাদ করেছেন। সাড়ে ৩ দিনের পত্রিকার জন্য পাঠকপ্রিয় এ লেখক-অনুবাদকের মুখোমুখি হয়েছিলেন আমিরুল আবেদিন

আপনার লেখালেখির জগত বিচিত্র। তবে তরুণ প্রজন্মের একাংশ আপনাকে মৌলিক থ্রিলার লেখক হিসেবেও চিহ্নিত করে। আপনি যে থ্রিলারের জগতে আসবেন, কীভাবে এলেন?


অনীশ দাস অপু : প্রথমেই একটা কথা স্পষ্ট করে নিতে চাই। আমি কিন্তু মৌলিক থ্রিলার লেখক না। আমি সবসময় বলি আমি যখন থ্রিলার লিখি তখন অ্যাডাপটেশন কিংবা অনুবাদ করি। তবে মৌলিক যে একেবারে লিখিনি তা নয়, সংখ্যায় অল্প। থ্রিলার বা রোমাঞ্চ কাহিনি ছোটবেলা থেকেই আমাকে টানত। আমাদের বাসায় দস্যু মোহন এবং কুয়াশা সিরিজের অনেক বই ছিল। এছাড়া কলকাতার দেবসাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত যখের ধন, আবার যখের ধন, মিসমিদের কবচ ইত্যাদি বইগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিল বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়। অসংখ্য কিশোরের মতো আমিও এই বইটি পড়ে কল্পনায় কতবার যে আফ্রিকার সেই বরফঢাকা পাহাড়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম তার হিসাব নেই। দেবসাহিত্য কুটিরের টারজান সিরিজের মনোলোভা প্রচ্ছদ আমাকে দারুণ টানত। টারজান পড়ে আমি আফ্রিকার গহীন অরণ্যে চলে যেতাম। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় আমার বাবা একদিন আমাকে দ্য ল্যান্ড দ্যাট টাইম ফরগট সিনেমাটি দেখিয়েছিলেন। আমার মনোজগতে রীতিমত তোলপাড় তুলেছিল ওই মুভি। আমি এতটাই অভিভূত হয়ে যাই, একদিন দ্য ব্ল্যাক আইল্যান্ড নামে একটি অ্যাডভেঞ্চার গল্প লিখে ফেলি। ওটা ছিল আমার জীবনের প্রথম মৌলিক থ্রিলারÑঅ্যাডভেঞ্চার কাহিনি। একদল প্রত্নতাত্ত্বিক একটি দ্বীপে গিয়েছিল হীরের খনির খোঁজে। সেখানে তারা ভয়ানক বিপদে পড়ে। মানুষখেকো, একশো ফুট লম্বা অজগর, ভয়ানক জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদিসহ যা কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ আছে সবকিছুর মোকাবেলা তাদেরকে করতে হয়। কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিয়েছিলাম গল্পটি লিখতে গিয়ে। হয়তো সেদিনই ভবিষ্যতের থ্রিলার লেখক হবার বীজ রোপণ হয়ে গিয়েছিল আমার মাঝে। যদিও লেখালেখির জগতে যখন পুরোপুরি ঢুকে পড়লাম তখন থ্রিলার বই অনুবাদ আর বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে দেশি পটভূমিতে অ্যাডাপটেশনের দিকে বেশি ঝুঁকেছি। আমি অ্যাডাপটেশনটা এমনভাবে করি যাতে আমার পাঠকরা মৌলিকের স্বাদ পান। মধ্যরাতের আতংক নামে আমার একটি হরর থ্রিলার আছে সম্পূর্ণ দেশি পটভূমিতে লেখা। বরিশাল শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরের একটি মফস্বলকে নিয়ে গড়ে ওঠা গল্প। সেখানে একটি বাড়ির বর্ণনা আছে। আমার পাঠকরা ভেবেছেন ওই বাড়িটি বুঝি সত্যি ওখানে আছে। দু’জন পাঠিকা ফোন করে আমার কাছে ঠিকানা চেয়েছিলেন ওই বাড়িতে একবার ঢুঁ মারার জন্য। ঢাকার মনিপুরী পাড়াকে কেন্দ্র করে প্রেতপুরী নামে আমার আরেকটি রোমাঞ্চোপন্যাস আছে, যেটি সিনেমাও হয়েছে স্বপ্নের ঘর নামে, সেটি পড়েও পাঠকরা এতটা চমৎকৃত হয়েছেন, ৮/১০ মনিপুরী পাড়ার ওই ভবনে তারা যেতে চেয়ে আমাকে চিঠিও লিখেছেন (এই বইটি লেখার আগে মনিপুরী পাড়ায় বেশ কয়েকবার চক্কর মেরে এসেছি অথেনটিক বর্ণনা দেয়ার জন্য)। আবার দুঃস্বপ্নের রাত নামে সাইকো থ্রিলারটি পড়ে দিনাজপুরের পল্লবী নামে একটি মেয়ে এমন ভয় পেয়েছিলেন, তিনি আর বাথটাবে গোসল করার সাহস পাননি। এই তথ্য আমাকে স্বয়ং জানিয়েছিলেন মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন। তিনি পল্লবীর চিঠিটি আলোচনা বিভাগে ছেপেও দিয়েছিলেন। ১৯৯৪’র ডিসেম্বরে দুঃস্বপ্নের রাত তাঁর সেবা প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় (এখানে অফ দ্য রেকর্ডে বলে রাখি, এই বইগুলো বেঙ্গলবুকস থেকে নতুন আঙ্গিকে পেপারব্যাকে আবার বেরোচ্ছে। যারা বইগুলো এখনো পড়েননি, পড়তে পারেন)। তো এভাবেই আমার থ্রিলারের জগতে প্রবেশ এবং পাঠকদের জন্য নিত্যনতুন থ্রিলার অনুবাদ ও অ্যাডাপ্ট করে চলেছি।
এই লেখালেখিটা আমার শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে। চর্চাটা আসলে আরম্ভ হয় ওই সময় থেকে। এরপর আস্তে আস্তে বিভিন্ন প্রকাশনী আর পত্রিকাগুলোতে আমার লেখালেখির যাত্রা চলতে থাকে এবং এখনও সেই যাত্রা অব্যাহত।
অ্যাডাপটেশনের দিকে কেন ঝুঁকলেন?
অনীশ দাস অপু : আমি গল্প বলতে চাই। সহজ ভাষায় সেগুলো পাঠকের সামনে উপস্থাপন করি। আর অ্যাডাপটেশনের মাধ্যমে চমৎকারভাবে গল্পটা নিজের মতো করে বলা যায়, যে স্বাধীনতাটুকু অনুবাদে থাকে না। তবে এই অ্যাডাপটেশনটা মূলত শিখেছি সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে। কিশোরবেলায় কাজী আনোয়ার হোসেনের তিনটি উপন্যাসিকা এবং ছায়া অরণ্য নামে দুটি থ্রিলার গল্পের বই পড়েছিলাম। জানতাম না গল্পগুলো বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে লেখা। পড়ার পর ভীষণ মুগ্ধ হই। অ্যাডাপটেশনটা তখন এমনভাবে করা হয়েছিল, লেখক মূল লেখাটি ভেঙেচুরে সম্পূর্ণ নতুন প্রেক্ষাপট বানিয়ে ফেলেছেন। একদমই মৌলিকের মতো হয়ে গেছে। এমনই একটা ঘটনা বলি। একটা গল্প পড়েছি, যেখানে মূল নায়ক ভয়ানক গরিব। ওই লোকের স্ত্রী একবার তাকে ১০ টাকার নোট দিয়ে জানাল, বাড়িতে আর টাকাপয়সা নেই। এই সামান্য অর্থ দিয়েই বাকি মাস চলতে হবে। ওই লোকের মাথায় নরক ভেঙে পড়ল। সে নোটের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই ১০ টাকার নোটটি যদি ডাবল হয়ে যেত তাহলে কতই না ভালো হতো। দেখতে না দেখতে ওখানে দশ টাকার আরেকটা নোট হয়ে গেল। ওই লোকের একটা অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। সেটার ব্যাখ্যা পরে দেওয়া হয়েছে। গল্পটা পড়ে আমি দারুণ মুগ্ধ হই। গল্পটা আমার কিশোরমনে এতটা নাড়া দেয়, আমি নিজেও একটা দশ টাকার নোট সামনে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে মনে মনে বলছিলাম, আহা, এখানে যদি আরেকটি দশ টাকার নোট হয়ে যেত তাহলে কতই না ভালো হতো! তবে তা তো আর হবার নয়। এখন ঘটনাটি মনে পড়লে হাসি পায়। যাহোক, আরেকটা গল্প বলি । জি কে চেস্টারটন নামে ব্রিটিশ একজন লেখক ছিলেন। উনি ফাদার ব্রাউন নামে একটি চরিত্রের স্রষ্টা। ফাদার ব্রাউন একাধারে গোয়েন্দা এবং পাদ্রী। এই ফাদার ব্রাউনকে নিয়েই কাজী আনোয়ার হোসেন ওস্তাদ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন। ওই গল্পে মূল চরিত্র একজন মওলানা। পাদ্রীকে তিনি মওলানা বানিয়েছিলেন। কী দুর্ধর্ষ অ্যাডাপটেশন! পরে দ্য ব্লু ক্রস নামে মূল গল্পটাও পড়েছি। আবার কাজীদার গল্পটাও পড়ে মিলিয়ে দেখেছি। দেখলাম, কাজীদা মূল গল্পটার চেয়েও অনেক ভালো লিখেছেন। এই বিষয়গুলো আমার মনে গেঁথে ছিল। সেবা প্রকাশনীর লেখকদের সমস্ত রহস্য উপন্যাস আমার পড়া। দু’একটি বাদে সবই বিদেশি কাহিনির অ্যাডাপটেশন। কিন্তু এতই মুন্সিয়ানার সাথে দেশি পটভূমিতে নতুন করে কাহিনি এবং চরিত্রচিত্রণ করা হয়েছে, বলে না দিলে বুঝবার উপায় নেই যে এগুলো বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে রচিত! আমার পাঠকরাও অ্যাডাপটেশন খুব পছন্দ করেন। আমি নিজেও লিখে মজা পাই। মৌলিকত্বের একটা স্বাদ পাওয়া যায়।
আপনি থ্রিলারকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
অনীশ দাস অপু : থ্রিলার শব্দের সরল বাংলা রোমাঞ্চোপন্যাস। থ্রিলারের অনেকগুলো ক্যাটাগরি আছে। আর সেগুলো হলোÑমিস্ট্রি, হরর, গোয়েন্দা, সাসপেন্স, অ্যাকশন, ক্রাইম, এসপিওনাজ, সুপারন্যাচারাল ইত্যাদি। সবই এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। সুবিশাল এই জনরা নিয়ে অনেকে লিখছেন। যার যেটা পছন্দ। বিশ্ব জুড়ে থ্রিলার সাহিত্যের জয়জয়কার। আমি এ পর্যন্ত বিশ্ববিখ্যাত বহু থ্রিলার লেখকের বই অনুবাদ করেছি। এদের মধ্যে আছেন অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, সিডনি শেলডন, জেফরি আর্চার, জ্যাক হিগিন্স, জেমস প্যাটারসন, ক্লাইভ কাসলার প্রমুখ। এঁরা বই লিখেই কোটিপতি হয়ে গেছেন। বিশ্ব জুড়ে তাঁদের অগণিত ভক্ত। এঁদের লেখা বই নিয়ে সুপারহিট মুভি হয়েছে। সত্যি বলতে কি, থ্রিলারকে যারা সস্তা বলে নাক সিঁটকায় তাদেরকে আমার করুণাই হয়। আমার মতে, থ্রিলার লেখা মোটেই সহজ কাজ নয়। দারুণ প্লট, দুর্দান্ত চমক আর টানটান উত্তেজনা থাকতে হয়। এই আমেজ সবাই তৈরি করতে পারেন না। যাঁরা পারেন তাঁরা সফল লেখক। পাঠকরা এই ধরনের বই পড়তে পছন্দ করেন বলেই প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে শত শত চমকপ্রদ থ্রিলার বই বের হচ্ছে এবং সেগুলো বেস্টসেলারও হচ্ছে। এই যেমন কাজী আনোয়ার হোসেন তাঁর কুয়াশা আর মাসুদ রানা দিয়ে কত লাখ পাঠক যে সৃষ্টি করেছেন, তার হিসাব নেই। প্রয়াত রকিব হাসান বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে তিন গোয়েন্দা লিখেও হাজার হাজার কিশোর পাঠককে আকৃষ্ট করেছেন। রোমাঞ্চপ্রিয় পাঠকরা যতদিন রোমাঞ্চের ঘোড়াটা দাবড়াবেন ততদিন এই জনরার আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হবে না।
আমাদের থ্রিলার সাহিত্যের পাঠক বাড়ছে। এখন প্রকাশনীগুলোও থ্রিলার নিয়ে আলাদা কাজ করছে। এই কাজের পরিসরটা লেখক হিসেবে কেমন উপভোগ করেন? লেখা সম্পাদনার বিষয়টিকেই বা কীভাবে দেখছেন?
অনীশ দাস অপু : বাংলাদেশের থ্রিলার সাহিত্যের বর্তমান এবং ভবিষ্যত আমি উজ্জ্বল দেখছি। স্রেফ থ্রিলার অনুবাদ এবং মৌলিক থ্রিলার বের করে কয়েকটি নতুন প্রকাশনা দাঁড়িয়ে গেছে। তরুণদের কেউ কেউ বেশ ভালোই লিখছেন। সিনিয়র লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন দুই বাংলাতেই থ্রিলার লেখক হিসেবে সমান জনপ্রিয়। আমি যতদূর জানি তাঁর সাফল্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই মৌলিক থ্রিলারের জগতে অনেক নবীনের প্রবেশ। তবে পাঠকপছন্দ জমজমাট থ্রিলার লেখা যেহেতু খুবই কঠিন, কাজেই এ জগতে থ্রিলার লেখক হিসেবে নাম কামাতে হলে তরুণদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। এ জন্য পড়াশোনাটা খুবই জরুরি।
একটু আগেই আপনাকে কাজীদার ব্যাপারে আমার মুগ্ধতার কথা বলছিলাম। এই মুগ্ধতাটা কেন? কারণ উনি শুধু একজন অনুবাদক আর ভালো লেখক এমন না, উনি ভালো সম্পাদকও। উনি জানতেন, কোন লেখাটি কেমনভাবে সম্পাদনা করলে সেটি পাঠকের মন জয় করতে পারবে। তিনি নিজে সম্পাদনা করতেন বলেই সেবা প্রকাশনীর বইগুলো এমন সুপাঠ্য। আমি যত প্রকাশনীর সঙ্গে কাজ করেছি, সব প্রকাশনীর ক্ষেত্রেই সম্পাদনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। আমাদের দেশে অনেক থ্রিলার বই হয়েছে। প্রচুর থ্রিলার অনুবাদ আসছে নিয়মিত। কিন্তু অনেকেরই অনুবাদের মান খারাপ বলে পাঠকদের অভিযোগ। কারণ শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস অনুবাদকদের কাজ হলেও এগুলোতে সুসম্পাদনার বড়ই অভাব। বানান এবং শব্দের ব্যবহারের দিকটিও সম্পাদনা করতে হয়। ১৯৯২ সালে যখন আমি রহস্য পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করি, তখন কিছু থ্রিলার গল্প অ্যাডাপটেশন করেছিলাম। আমি অবশ্য কোথাও বলিনি এগুলো বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা। দেখলাম, দেশীয় পটভূমিতে এমন থ্রিলারের পাঠকপ্রিয়তা সাংঘাতিক। এ কাজগুলো আমাকে অনেক গুছিয়ে করতে হয়েছে। তারপরও যেসব ভুলত্রুটি ছিল, রহস্য পত্রিকার অভিজ্ঞ সম্পাদকরা ঠিকঠাক করে দিয়েছেন। আমাদের এখানে সম্পাদনার বিষয়টি নিয়ে আমার অনেক হতাশা রয়েছে। অধিকাংশ প্রকাশনী থ্রিলার ছাপাতে চায়। কিন্তু তারা ঠিক কতটা সম্পাদনায় মনোযোগ দেয়? তবে এখন একটু পরিবর্তন আসছে। কারণ থ্রিলারের পাঠকরা সচেতন হয়ে যাচ্ছেন। তারা এখন কিছু দিলেই তা নিয়ে নেন না। অনেক বাছাই করে পড়েন। তাই বইয়ের মান ভালো করার দিকে প্রকাশনী থেকে রচয়িতা, সবাইকেই মনোযোগ দিতে হয়।
থ্রিলার সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় দিক হলো, অনেক লেখাই এখন ওয়েব সিরিজ বা ভিজ্যুয়ালেও ইন্টারটেক্সচুয়াল হয়ে উঠছে। আপনি কি এই সম্ভাবনাকে থ্রিলারের একটি শক্তিশালী দিক বলে ভাবেন?
অনীশ দাস অপু : থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে ওয়েব সিরিজ কিংবা সিনেমা নির্মাণের একটা ট্রেন্ড বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে গত ৬-৭ বছর ধরে। পশ্চিমবাংলা অবশ্য এ বিষয়ে আরও আগে থেকে এগিয়ে। ওখানকার নির্মাতারা আমাদের দেশের মৌলিক থ্রিলার নিয়েও কাজ শুরু করেছেন। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের জনপ্রিয় থ্রিলার উপন্যাস রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি নিয়ে ওপার বাংলায় ওয়েব সিরিজ হয়েছে। যদিও পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় মূল বইয়ের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। মূল বই থেকে অনেকটা সরে যাওয়ায় আমাদের দর্শকরা হতাশই হয়েছেন। বই পড়ে যে রোমাঞ্চটা ফিল হয়, ওয়েব সিরিজ তেমন শিহরিত করতে পারেনি। তবে আমাদের দেশে যেসব থ্রিলার ওয়েব সিরিজ বানানো হয়েছে আমি তার কয়েকটি দেখেছি। আমার কাছে দারুণ লেগেছে। যেমন মহানগর, কারাগার, তকদির, মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন ইত্যাদি। নুহাশ হুমায়ূন তো তাঁর হরর থ্রিলার দিয়ে দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কারও জিতেছেন। তরুণ নির্মাতারা যে আসলেই মেধাবী তা তাদের তৈরি টিভি সিরিজগুলো দেখলেই বোঝা যায়। আমি তো খুবই আশাবাদী, এই প্রতিভাবানরা অচিরেই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় নিজেদের প্রতিভার দৃষ্টান্তমূলক স্বাক্ষর রাখতে পারবেন।
বেঙ্গলবুকস থেকে আপনার প্রকাশিত একটি থ্রিলার রয়েছে। এই বইটি সম্পর্কে সংক্ষেপে যদি কিছু বলেন।
অনীশ দাস অপু : বেঙ্গলবুকস থেকে গত বছর আমার দুটি থ্রিলার বই বেরিয়েছে। একটি অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার শত্রু ভয়ংকর, অপরটি কিশোর গোয়েন্দা থ্রিলারÑশ্শ্শ্। দুটি বই-ই বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে রচিত। যদিও প্রধান চরিত্র বাঙালি। শত্রু ভয়ংকর-এর নায়ক মনীশ দত্ত। বইয়ের কাহিনি সংক্ষেপে বলা হয়েছেÑমনীশ দত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এককালের তুখোড় ছাত্র এবং অ্যাডভেঞ্চারার, যার প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে রয়েছে অগাধ কৌতূহল। অ্যাডভেঞ্চারের নেশা তাকে নিয়ে যায় সুদূর পেরুর গহীন জঙ্গলে এবং সেখান থেকে আমেরিকা হয়ে নেপাল, মিশর এবং সবশেষে ভূমধ্যসাগরের নিষিদ্ধ এক দ্বীপে; যেখানে উন্মোচিত হবে হারানো এক আর্কের গোপন রহস্য, যা গোটা পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য বিশাল এক হুমকি। এই হুমকি কি রুখে দিতে পারবে মনীশ দত্ত? তাকে পদে পদে বিপদে ফেলছে যে ভয়ংকর শত্রু, তার কবল থেকেই বা কী করে রক্ষা পাবে সে? কিংবা উদ্ধার করতে পারবে শত্রুর হাতে বন্দিনী প্রেমিকাকে?
ন্যান্সি ড্রিউ নামে আমেরিকায় দারুণ জনপ্রিয় একটি গোয়েন্দা সিরিজ আছে। মূলত ওই সিরিজটির অনুপ্রেরণা থেকে শ্শ্শ্র শুরু। একদম শুরুর বই থেকে অ্যাডাপটেশন করেছি। কাহিনি এবং চরিত্রচিত্রণে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছি। বেশ কিছু জায়গায় মডিফাই করা হয়েছে গল্প, চরিত্রগুলোতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া থেকেছে। মূল চরিত্র ন্যান্সি ড্রিউকে বানিয়েছি প্রবাসী বাংলাদেশি ডিটেকটিভÑশ্রাবণী চৌধুরী, তার আমেরিকান বান্ধবী শেরিল উইলিয়ামস এবং ভারতীয় বান্ধবী সুজানা শর্মা। ওরা তিনজনে মিলে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তৈরি করেছেÑশ্শ্শ্। সিরিজের নামÑটিন ডিটেকটিভস। এই সিরিজের প্রথম বইÑশ্শ্শ্। দ্বিতীয় বই ষড়যন্ত্রের জালও রেডি। আগামীতে এই সিরিজ থেকে আরও বই বেরোবে বলে আশা রাখি।
থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
অনীশ দাস অপু : থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে আমার ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। বেঙ্গলবুকসের সঙ্গে আমার থ্রিলার নিয়ে অনেকগুলো পরিকল্পনা আছে। আগামীতে বেঙ্গলবুকস থেকে নিয়মিত আমার হরর থ্রিলার বেরুবে। কিছু হবে অনুবাদ, বাকিগুলো অ্যাডাপটেশন। আমি সম্পূর্ণ দেশি পটভূমিকায় কয়েকটি সাইকোলজিক্যাল এবং ক্রাইম থ্রিলার লিখব, যা পাঠকদেরকে অন্যরকম স্বাদ পাইয়ে দেবে। আমি আমার পাঠকদেরকে সবসময়ই এমন বই উপহার দিতে চাই, যা পড়ে তারা শিহরিত এবং রোমাঞ্চিত হবেন। বেঙ্গলবুকস থেকে অচিরেই আমার যেসব থ্রিলার কাহিনি প্রকাশিত হবে তা পাঠকদেরকে দারুণভাবে ধরে রাখবে, নিশ্চয়তা দিতে পারি। আমার কাজ পাঠকদের আনন্দদান করা। তারা আমার অনুবাদ যেমন উপভোগ করেন, দেশি পটভূমিতে সাজানো বিদেশি গল্পগুলোও তাদেরকে সমান আনন্দ দেয়। আগামীতেও তাই করতে চাই এবং পাঠকরা সেই বইগুলো পড়ে আনন্দ পেলেই লেখক-অনুবাদক হিসেবে এটুকুই আমার প্রাপ্তি এবং সন্তুষ্টি হবে!

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular