Homeইন্টারভিউলোকসাহিত্যে আসলে পুনঃসৃষ্টি হয়

লোকসাহিত্যে আসলে পুনঃসৃষ্টি হয়

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ একজন ভাষাবিদ, লেখক এবং লোকগবেষক। প্রবন্ধ ও গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন।
তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৭ সালের ১৩ মে থেকে ২০০৯ সালের ১২ মে পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ নতুন চর্যাপদ প্রকাশ করে মাইলফলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সাড়ে ৩ দিনের পত্রিকার জন্য তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন রাজীব চক্রবর্ত্তী

ফোকলোর নিয়ে আপনার অনেক কাজ রয়েছে। এটি একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক শাখা। কিন্তু লোকসংস্কৃতি বা ফোকলোর যা-ই বলা হোক না কেন, এটির একটি সাহিত্যিক দিকও রয়েছে। প্রচলিত সাহিত্যে লোকসাহিত্যের প্রভাব নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : লোকসাহিত্য একটু আলাদা। তবে শুরুতে প্রচলিত সাহিত্য নিয়েই কথা বলা যাক। বাংলা প্রচলিত সাহিত্য আসলে দুটো আঙ্গিকে বিচার করতে হবে। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপিনির্ভর সাহিত্য। এরপর আধুনিক যুগে ছাপাখানানির্ভর সাহিত্য। মধ্যযুগ পর্যন্ত সময়ে সাহিত্যের একটা বিশাল অংশ লোকমুখে ছিল। যেমন পুঁথিসাহিত্য মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। যেহেতু লোকমুখে সাহিত্যের প্রচার-প্রসার হয়েছিল সেহেতু লোকসাহিত্যের সঙ্গে প্রচলিত সাহিত্যের এক ধরনের যোগ আছে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, লোকসাহিত্য থেকে বিভিন্ন উপাদান নিয়েই মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও অন্নদামঙ্গল লেখা হয়েছে। একই কথা ময়মনসিংহ গীতিকার ব্যাপারেও বলা যায়। মধ্যযুগ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপিনির্ভর সাহিত্যের ক্ষেত্রে লোকসাহিত্য আর প্রচলিত সাহিত্যের এভাবে একটি সম্পর্ক ছিল। আবার আধুনিক যুগের দিকে তাকালেও কিন্তু আমরা কিছু ধারণা পাই। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অনেক কবিতায় লোকসাহিত্যের বহু উপাদান ও রসদ আছে। কথাসাহিত্য, ছড়া এমনকি গল্পেও লোকসাহিত্যের বহু উপাদান, অনুষঙ্গ এসেছে। এটা বিশ্বসাহিত্যের বহু ভাষায় দেখা যাবে। বাংলা সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। লোকসাহিত্যকে বুঝতে হলে বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও বুঝতে হবে। আমাদের জাতীয় জীবনের শেকড় সেই গ্রামীণ অবকাঠামোতে। জনপদে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে যুগের পর যুগ ধরে প্রচলিত মৌখিক ধারার সাহিত্যই কিন্তু লোকসাহিত্য। এ ধারার সাহিত্য অতীত ঐতিহ্য ও বর্তমান অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে রচিত হয়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে একটি সংহত সমাজমানস থেকে এর উদ্ভব। সাধারণত অক্ষরজ্ঞানহীন পল্লিবাসীরা স্মৃতি ও শ্রুতির ওপর নির্ভর করে এর লালন করে। মূলে ব্যক্তিবিশেষের রচনা হলেও সমষ্টির চর্চায় তা পুষ্টি ও পরিপক্বতা লাভ করে। এজন্য লোকসাহিত্য সমষ্টির ঐতিহ্য, আবেগ, চিন্তা ও মূল্যবোধকে ধারণ করে। বিষয়, ভাষা ও রীতির ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারাই এতে অনুসৃত হয়। কল্পনাশক্তি, উদ্ভাবন-ক্ষমতা ও পরিশীলিত চিন্তার অভাব থাকলেও লোকসাহিত্যে শিল্পসৌন্দর্য, রস ও আনন্দবোধের অভাব থাকে না। সেই আঙ্গিকে লোকসাহিত্য লোকসংস্কৃতির একটি জীবন্ত ধারা; এর মধ্য দিয়ে জাতির আত্মার স্পন্দন শোনা যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে ‘জনপদের হৃদয়-কলরব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে লোকসাহিত্যের যে উপাদান, অনুষঙ্গের কথা বলছেন তা আসছে কীভাবে?

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : সাহিত্য তো সৃজনের বিষয়। এখানে একজন রচয়িতা আছেন। যিনি সাহিত্য নির্মাণ করছেন, তার জীবন সংস্কৃতির বাইরে নয়। শৈশব থেকেই সংস্কৃতিই মানুষকে নির্মাণ করে। অতীতে প্রযুক্তির এতটা বিকাশ হয়নি। তখন আমাদের এক ধরনের গ্রামীণ সংস্কৃতিতেই বাস করতে হয়েছে। এখন সময় বদলেছে। প্রযুক্তির এত উন্নয়ন হয়েছে যে মানুষ সহজেই অনেক তথ্য পাচ্ছে। বিনোদনের জন্য তাকে অনেক দূরে যেতে হচ্ছে না। এ বদল আছে। কিন্তু আমাদের সাহিত্যে এখনও অনেক লেখক বেঁচে আছেন যাদের শৈশব ও বেড়ে ওঠা অতীতের এমন এক সময়ে যখন প্রযুক্তির এতটা বিকাশ ঘটেনি। তারা এখনও সাহিত্যচর্চা করছেন। তাদের লেখায় লোকগাথার অনেক অনুষঙ্গ ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনটা ভালো দিক। চর্চার জায়গাটা আছে ঠিকই। এক্ষেত্রে পাঠকের সচেতনতা বেশি জরুরি। এখন লোকসাহিত্য আসলে সাহিত্যেরই একটি অংশ। এটাকে আমরা সাহিত্যের বাইরে বিবেচনা করতে পারব না। প্রচলিত সাহিত্যকে যদি ছাপাখানা থেকে ছাপানো বই হিসেবে বিবেচনা করি তবুও তো লোকসাহিত্যকে বাদ দেয়া যায় না।

এক্ষেত্রে কি লোকসাহিত্যিক বলে কোনো ধারণা থাকতে পারে?

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : লোকসাহিত্যের তো ওই অর্থে কোনো নির্দিষ্ট রচয়িতা থাকার কথা নয়। তারপরও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লোকসাহিত্যের নানা উপাদানের সঙ্গে এক বা একাধিক রচয়িতার নাম জড়িয়ে আছে। সেটা থাকতে পারে। আছেও। কিন্তু এমনিতে লোকসাহিত্যিক বলে কাউকে চিহ্নিত করা যায় না। বরং আমরা বলি, যারা লোকসাহিত্য বা সংস্কৃতিতে অবদান রেখেছেন তাঁরা সবাই একটি ধারা অনুসরণ করেছেন। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ইংরেজ কবি জেন টেয়লর লিখেছিলেনÑটুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার। এ কবিতাটি লেখার অনুপ্রেরণা কিন্তু তিনি একটি ঐতিহ্য থেকে নিয়েছিলেন। একইভাবে বাংলা সাহিত্যে আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথ লিখছেনÑবৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর। বাংলাদেশে এভাবে গীতিকা, ছড়া, কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাসে লোকসাহিত্যের নানা উপাদান এসেছে। লোকসাহিত্যিক বলে আলাদা কোনো ধারণা না থাকলেও এক্ষেত্রে কিন্তু ধারাটিকে আমরা বিবেচনা করতে পারি। যারা লোকসাহিত্যকে পুনঃসৃষ্টি করছেন তাদেরকেও আমরা লোকসাহিত্যিক বলে অভিহিত করতে পারি ওই অর্থে। এই যেমন বাউলরা আছেন। শাহ আবদুল করিম, বিজয় সরকারের মতো অনেকেই আছেন, যাঁরা আসলে লোকসাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখেছেন এবং সেভাবে পুনঃসৃষ্টি করেছেন। লোকসাহিত্য মূলত বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন একটি অঙ্গ হিসেবে থাকবে।

লোকসাহিত্য, সংস্কৃতি বা লোকগাথা যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এ বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি একাডেমিক শাখা আছে। আমরা এটিকে ফোকলোর বলি। সাহিত্য বিষয়ক অধ্যয়ন আর ফোকলোর সম্পর্কে এখনও অনেকের জ্ঞান আসলে স্পষ্ট না। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার ভাবনা জানতে চাচ্ছি।

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : আসলে ফোকলোর সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলার নেই। ফোকলোর অনেক আগে থেকেই ছিল। লোকসাহিত্য বা ফোকলোর যে আগে ছিল না এমন তো না। আগেও ছিল। এখন জ্ঞানকাণ্ডের স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে এটিকে শনাক্ত করা হয়েছে মাত্র। বাংলা প্রচলিত সাহিত্যের সঙ্গে ফোকলোরকেও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ভাবার সূচনা বঙ্গভঙ্গের পর থেকেই। এটা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে। এরপর গোটা বিশ্বেই ফোকলোর একটি আলাদা ডিসিপ্লিন হিসেবে চর্চা শুরু করে।

এ মুহূর্তে আমাদের সাহিত্যে কিংবদন্তী (লেজেন্ড), পুরাণ (মিথ) এসবের ব্যবহার বাড়ছে। উপন্যাস, নাটক এগুলোতে পুরাণ আর মিথকে যেভাবে উপজীব্য করা হয়, লোকসাহিত্যকে উপজীব্য কি সেভাবে করা হয়? করলে আসলে কীভাবে আসছে সেগুলো?

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : লোকসাহিত্যে আসলে পুনঃসৃষ্টি হয়। যেমনটা বলেছি, লোকসাহিত্যে তো প্রাচীন ঐতিহ্যের ভাব ও সুরকে অনুকরণ করে আবার নতুন করে উপস্থাপন করা হয়। এখন সাহিত্যে আমরা অনেক সময় কিংবদন্তী বা পুরাণকে ব্যবহার করি। কিংবদন্তী ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘বেলুয়া সুন্দরী’র উদাহরণ টানা যেতে পারে। এ আখ্যানকে তো নাটক, কবিতা থেকে শুরু করে নানা জায়গায় নানাভাবে ব্যবহার করা যায়। এখন এসব উপাদানকে আসলে কীভাবে ব্যবহার করা হবে তা নির্ভর করছে রচয়িতার ওপর। খুবই পরিচিত একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সৈয়দ শামসুল হকের নূরলদীনের সারাজীবন তো একটি কিংবদন্তীর ওপর ভিত্তি করে লেখা। এর মূল গল্পটি কিন্তু এসেছে উত্তরবঙ্গ থেকে। নাটকটিতে কৃষকনেতা নূরলদীনের আত্মত্যাগ, সাধারণ মানুষের শোষণ-বঞ্চনা এবং প্রতিরোধের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মূল কাহিনিÑছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর বাংলা যখন দুর্ভিক্ষে জর্জরিত তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তাদের দালাল দেবী সিংহ কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় শোষণ চালায়। এর প্রতিবাদে নূরলদীন কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ‘লেংটা’ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এ কিংবদন্তীকে অবলম্বন করেই নাটকটি লেখা হয়েছে। এখানে সৈয়দ হক তাঁর নিজের কল্পনায় এ কিংবদন্তীকে যেভাবে দেখেছেন, সেভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা কিন্তু তাদের লোককাহিনিকে অনেক গুরুত্ব দেয়। রুশ রূপকথা, গ্রিক রূপকথা, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রূপকথার ভালো সংকলন আমরা দেখি। জাপানে তো এগুলোকে ভিত্তি করে এনিমে, মুভিও তৈরি হচ্ছে। আমাদের এখানে লোকসাহিত্য নিয়ে চর্চাটা আসলে কেমন? কতটুকু?

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : লোকসাহিত্যকে আসলে দুভাবে সংরক্ষণ করা যায়। দুটা দুধরনের প্রক্রিয়া আসলে। লোকসাহিত্যের ক্ষেত্রে একটা বিষয় হলো, এটা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায়। শুধু সময় কেন, স্থানভেদেও লোকসাহিত্য বা সংস্কৃতি পালটে যায়। লোকসাহিত্য চর্চা আমরা দুভাবে করতে পারি। প্রথমত আমাদের অতীত ঐতিহ্যের উপাদানগুলোকে সংগ্রহ করে সংকলন করা। বাংলা একাডেমি বেশ কয়েকটি সংকলন করেছে। এছাড়া সংবাদমাধ্যম, ম্যাগাজিন বা প্রবন্ধেও লোকসাহিত্যের প্রসঙ্গ আসছে। নতুন গবেষণা হচ্ছে। আরেকটি হচ্ছে লোকসংস্কৃতিকে পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। এমন হতেই পারে যে আপনি ওই লোকসংস্কৃতির ধারার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন এবং ওই পরিচয়ের ভিত্তিতেই নতুনভাবে লোকসাহিত্যকে সৃষ্টি করছেন। অর্থাৎ এ দুই প্রক্রিয়াতেই লোকসাহিত্যকে সংরক্ষণ ও চর্চা করার সুযোগ আছে।

বাংলাদেশে লোকসাহিত্য চর্চার বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে দেখেন?

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : এখানেও দুটো দিক আছে। দেখা যায় অনেকে লোকসাহিত্যকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন। তাতে আমার আপত্তি নেই। এমন যদি হয়, কেউ লোকসাহিত্যের পূর্ণ ভাবগাম্ভীর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে এমনটি করছেন, তাহলে অন্তত কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। এমনটিতে আমার নিজের কোনো অসুবিধা নেই। এমনটি অনেকে করেন। এটিকে সাংস্কৃতিক একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা যারা করেন, তারা ঐতিহ্য ও ধারার দিকটি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তখনই যখন কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য বিকৃত করে ফেলে। অর্থাৎ লোকসাহিত্যের ধারাবাহিক সুর ও ভাবগাম্ভীর্যকে নষ্ট করে ফেলে। একটা উদাহরণ আবার দেই। এই যে ‘ইশকুল খুইলাছেরে মাওলা ইশকুল খুইলা ছে’Ñএটা কার গান? রমেশ শীলের গান। তাই তো? এখন এ গানটাকে যেভাবে গাওয়া হয় তাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অথচ একদম শুরুতে এ গানটাকে ভিন্নভাবে গাওয়া হতো। এখন এ গানটাকে যেন লাফঝাপের কর্মকাণ্ড বানিয়ে ফেলা হয়েছে। মাইজভান্ডারি কিছু গান আছে। এসব গান কীভাবে গাওয়া হয় তা নির্দিষ্ট অঞ্চলে গেলে বোঝা যায়। আবার এ গান যখন শহরে মঞ্চে গাওয়া হচ্ছে তখন আরেক রকম। মানে এক ধরনের কৃত্রিম ভাব কিন্তু এখানে চলে এসেছে। আমি প্রথমেই অবশ্য বলেছি লোকসাহিত্য পরিবর্তনশীল। কিন্তু এ পরিবর্তন ব্যক্তি একক সিদ্ধান্তে করতে পারেন না। সময়ের নিরিখে সমাজের মানুষেরা সম্মিলিতভাবে পরিবর্তন আনেন। এখানে লোকের সম্মিলন ঘটে। এ বাস্তবতাকে তো আমরা এড়াতে পারব না। অনেকে লোকসাহিত্যের অনুপ্রেরণা নিয়ে তা পুনর্নির্মাণ করেন। কিন্তু তা বিকৃত করতে পারবেন না। পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে কতটুকু স্বাধীনতা তিনি পাবেন এর নির্দিষ্ট মানদণ্ড অবশ্য নেই। এখানে লোকসাহিত্যের ধারার চর্চা যারা করছেন তাদের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি চলে আসে। অর্থাৎ বাউল, পালাকার বা যারা লোকসাহিত্য চর্চা করেন ওই অর্থে, তাদের অনেক সৃজন কেউ কেউ ব্যবহার করেন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। সেগুলো থেকে তো লাভবান হচ্ছেন অনেকে। কিন্তু যাঁরা লোকসাহিত্যের অংশীজন তাঁরা প্রায়শই আর্থিক সংকটে ভোগেন। অংশীজনরাই যখন সংকটে, তখন চর্চার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার মতো মানুষের অভাব হওয়াই স্বাভাবিক। লোকসাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা এখনও মেধাস্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। অবশ্য লিখিত সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে অবশ্যই। লোকসাহিত্য চর্চার ধারাটিকে রক্ষা করাও কিন্তু চর্চার অংশ। এখন ক্রমেই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই লোকসাহিত্য সংরক্ষণ ও সংকলনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। লোকসাহিত্যের ধারা যাঁরা ধরে রেখেছেন তাঁদের কিন্তু সম্মানী ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। রমেশ শীলের সম্পর্কে জানি। খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। এমনটি হওয়া উচিত নয়। লোকসংস্কৃতিকে রক্ষা জাতীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়কে ধারণের অংশ। এ দিকটি ভুলে গেলে চলবে না।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular