শাকুর মজিদ একাধারে লেখক, স্থপতি ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। সমসাময়িক সময়ে তিনি ভ্রমণসাহিত্য ধারাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। পৃথিবীর নানা দেশে ভ্রমণ করে সে অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যিক ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তার ভ্রমণকাহিনিতে শুধু দৃশ্যের বর্ণনা নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষ ও সাহিত্য দর্শনের নানা প্রসঙ্গও উঠে আসে। ভ্রমণ সাহিত্য ও নিজের অভিজ্ঞতার মিশেলে সাড়ে তিন দিনের পত্রিকার প্রতিনিধির মুখোমুখি হয়েছিলেন এ গুণী লেখক।
আপনাকে আমরা অজানা পথের ভ্রমণকার বলেই চিনি। ভ্রমণকে তো আপনি দৃশ্যের বর্ণনা নয়, বরং সময়ের প্রতীক বলেই উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। এর জন্য তো একটা শুরু দরকার। সেটা কীভাবে এলো?
শাকুর মজিদ : শুরুটা ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে। তরুণ বয়সে নতুন নতুন জায়গা দেখার প্রতি আগ্রহ ছিল। কৌতূহলও ছিল। সে তাগিদে তো দেশে নানা জায়গায় ঘোরা হতো। তাছাড়া আমার শিক্ষাজীবনটাও এমন যে আসলে সবসময় ছুটতে হয়েছে। ক্যাডেট কলেজে থাকা অবস্থায় ঘুরেছি। আবার লালন, হাসন রাজাসহ লোকসংস্কৃতির অনেক অনুসঙ্গ খুঁজতে গিয়েও ঘুরতে হয়েছে। সেগুলো ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় এসেছে বহুবার। তবে আমার ইচ্ছে ছিল বিদেশেও ঘুরবার। ১৯৯০ সালে সে সুযোগও এসে গেল। দেশের বাইরে প্রথম কলকাতা দিয়ে ভ্রমণ শুরু করি। এরপর তো অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেল। অনেকগুলো দেশ ঘোরা হয়েছে। ৩০টিরও বেশি অবশ্যই। এখন আমি যখন ঘুরেছি তখন শুধু চারপাশের দৃশ্য দেখেছি এমন না। বরং আশপাশের মানুষ এবং প্রাণের যে বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা তা দেখার চেষ্টা করেছি। একটা নদী দেখলে সেটাকে শুধু নদী বলে বিচার করার সুযোগ আসলে নেই। ভ্রমণের মাধ্যমে যে অচেনাকে দেখছি, তার মধ্যে নিজেকেও দেখা হয়। নিজের যা অচেনা বা পরিচিত নয় সেটুকুকে ধারণ করা যায় ভ্রমণের মাধ্যমে।
ঘুরাঘুরি ইচ্ছেটাকে যে লেখার রূপ দেয়া যায় এ ভাবনা এল কীভাবে আসলে? এমনিতে আপনার ভ্রমণ নিয়ে লেখার ধরনটাও আলাদা। ভ্রমণ সাহিত্য সম্পর্কে আপনার ভাবনাটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে বলুন।
শাকুর মজিদ : ঘুরাঘুরি শুরু করার পর অনেক অভিজ্ঞতা তো হচ্ছিল। এক সময় মনে হলো, এ অভিজ্ঞতাগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভেবে সঞ্চয় করলে চলবে না। এগুলোকে লেখার রূপ দেয়া যায়। আমার অবশ্য লেখালেখি শুরু হয় নাটক লেখার মাধ্যমে। ভ্রমণ করতে গিয়ে তো অনুধাবন করলাম যে এখানে অনেক কিছুই আছে যা উপস্থাপন করা যায়। আর ওই সময় পত্র-পত্রিকাতেও ভ্রমণ কাহিনীর অনেক চাহিদা ছিল। পাঠকেরও আগ্রহ দেখলাম। তাই লেখার আগ্রহ তৈরি হলো। ভ্রমণ অনেক শ্রমলব্ধ কাজ। আরও শ্রমলব্ধ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে নিরপেক্ষ ও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা। তখন থেকেই ভ্রমণ নিয়ে লেখাটা অভ্যাস হয়ে যায়। এরপর তো অন্তত ১৯টা ভ্রমণ বিষয়ক বই লিখেছি। কথাপ্রকাশ থেকে সমগ্রও বেরিয়েছে। আমি নাটক বাদে মূলত স্মৃতিকথা আর ভ্রমণকথাই লিখেছি। কারণ আমার ব্যস্ততার সঙ্গে এ ধরনের লেখাই বেশি খাপ খাইয়েছে।
তো আপনার কাছে তো ভ্রমণ নিয়ে লেখাটা শুধু ঘুরাঘুরির বর্ণনা নয়। তাই না?
শাকুর মজিদ : হ্যাঁ। তা তো অবশ্যই। অনেকের মধ্যে একটা ধারণা আছে ভ্রমণ মানেই কোনো সুন্দর বা জনপ্রিয় জায়গায় যাওয়া। কোথাও গিয়ে ছবি তোলা। আবার সেগুলোকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা। কিন্তু সাহিত্যিক অর্থে ভ্রমণ অনেক বিস্তৃত বিষয়। যেকোনো জায়গার সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপনের ধরন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি—এসবকিছুই এখানে যুক্ত থাকে। ভ্রমণে আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা হয়। এই অভিজ্ঞতাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরাই ভ্রমণসাহিত্যের কাজ। কারণ মানুষও নতুন জায়গার কথা জানতে চায়। হয়তো অনেকের পক্ষে সে অভিজ্ঞতা জানাও সম্ভব হয় না। ভ্রমণসাহিত্যের মাধ্যমে সে অভিজ্ঞতাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে হয়। এমনভাবে তুলে ধরতে হয় যাতে পাঠকও তা অনুভব করে।
আপনার লেখায় আমরা দেখি মানুষের গল্পটাকে গুরুত্ব দেন। এটা অনেকাংশে নতুন একটা ধরণ। এ বিষয়টা কেমন?
শাকুর মজিদ : কোনো একটা জায়গাকে বুঝতে হলে সেখানকার মানুষকে জানতে হবে। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা কোনো শহর—সবগুলোই নিজ নিজ আঙ্গিকে সুন্দর। কিন্তু সেখানে মানবিক স্পর্শ না থাকলে আর মানুষের গল্প না থাকলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর বর্ণনা যখন দেবেন, তখন আসলে বেশি কিছু কী বলার আছে? নদী তো নদীই। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট স্থানের নদী, তার সঙ্গে জুড়ে থাকা নাম—এগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আছে। তাই কোথাও গেলে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। মানুষের কাছে শুনতে শুনতে ভ্রমণকাহিনীর কাঠামোটা তৈরি হয়ে যায়। এজন্য আমার একেকটা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পাঠককে একেক ধরনের অনুভূতি দেয়। ভ্রমণের সময় আমি সেই দেশের সাহিত্য ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করি। যেমন চিলিতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে কবি পাবলো নেরুদার কথা। আবার গ্রিসে গেলে মনে পড়ে দার্শনিক সক্রেটিস-এর ইতিহাস। এই ধরনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি একটি জায়গাকে বুঝতে সাহায্য করে। তাই ভ্রমণকাহিনিতে এগুলো স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়। মজার ব্যাপার হলো, আমার ভ্রমণ শুরু হয় কলকাতা দিয়ে। কিন্তু আমি কলকাতা ভ্রমণ নিয়েই কিছু লিখিনি। পরে অবশ্য ১০ সদর স্ট্রিট: রবীন্দ্রনাথের কলকাতা নামে একটি ভ্রমণগ্রন্থ লিখি। এ বইটি লেখার সময় আমি শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই অনেক তথ্য পেয়েছি এমন না। কীভাবে আসলে কলকাতা সিটি অব জয়, সিটি অব গ্লাস থেকে রবীন্দ্রনাথের শহর হলো সে জ্ঞানও পেলাম। এভাবে প্রতিটা বইয়েই আমি মানুষকে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। এটাকে নিছক নিঃসঙ্গতার বয়ান রাখতে চাইনি।
আপনি ভ্রমণ কাহিনীতে ইতিহাসের অনুসঙ্গ অনেক ব্যবহার করেন। এটি কী সচেতনভাবেই করা হয়?
শাকুর মজিদ : হ্যাঁ। কোনো জায়গাকে বুঝতে হলে তার ইতিহাস জানা জরুরি। আমরা যদি কোনো শহরে যাই কিন্তু সেই শহরের অতীত সম্পর্কে কিছু না জানি, তাহলে সেই জায়গাটিকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয় না। তাই আমি চেষ্টা করি ভ্রমণের আগে সেই জায়গার ইতিহাস সম্পর্কে কিছু পড়াশোনা করতে। অনেক সময় সেই তথ্যই লেখাকে সমৃদ্ধ করে। যেমন ফেরাউনের গ্রাম নামে আমার একটা বই আছে। এ বইটি লিখতে আমার অনেক সময় লেগেছে। মিশর তত্ত্ব, কোরান ও বাইবেলের তথ্য যাচাই করা আর ৫ হাজার বছরের মিশরীয় ফারাও রাজাদের কাহিনী আত্মস্থ করতে অনেক সময় লাগে। সেগুলো আত্নস্থ আর যাচাই করার পরিশ্রমলব্ধ কাজটা করতে হয়েছে। এগুলো সচেতনভাবেই আসলে করা হয়। তাছাড়া চিত্রনির্মাতা হওয়ায় আমাকে ছবি নিয়েও কাজ করতে হয়। ভ্রমণকাহিনী মানে শুধু আপনি স্থানের বর্ণনা দিয়ে গেলেন এমন নয়। আপনাকে অবশ্যই সে জায়গাটিও তুলে ধরতে হবে। এখন তো ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা যায়। সেগুলোকে অনেক সুন্দরভাবে উপস্থাপনের প্রযুক্তিও আছে। এগুলো সম্পর্কে জানাশোনাও দরকার।
ভ্রমণকাহিনী লেখার কাজটি তো শ্রমসাধ্য অবশ্যই। আপনি কীভাবে করেন? আর ভ্রমণ লেখকের আসলে কোন বিষয়ে বেশি দক্ষ হতে হয়?
শাকুর মজিদ : সাধারণত নোট রাখার চেষ্টা করি। কোথায় কী দেখলাম, কার সঙ্গে কথা হলো—এসব লিখে রাখি। পরে সেই নোটের ওপর ভিত্তি করে লেখা তৈরি করি। কখনো কখনো একটি ভ্রমণ শেষ হওয়ার অনেক দিন পরে লেখা হয়। তখন অভিজ্ঞতাগুলোকে আবার নতুন করে ভাবতে হয়। এখন ভ্রমণ লেখকের দক্ষতার কথা ভাবলেই তার চর্চার জায়গাটি আসে। এখানে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটা বেশি জরুরি। অনেক মানুষ একই জায়গায় ভ্রমণ করেন, কিন্তু সবাই একই অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসেন না। কারণ কেউ কেউ বেশি মনোযোগ দিয়ে দেখেন, শোনেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন। পর্যবেক্ষণই লেখাকে আলাদা করে তোলে। এখন অনেকেই ভ্রমণ নিয়ে লেখায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এটা ভালো দিক। তবে ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে নিরসভাবে লিখে গেলে হবে না। পর্যবেক্ষণ দিয়ে বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে পড়াশোনাটাও অনেক জরুরি। বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণসাহিত্যের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। অতীতের অনেক লেখক তাঁদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখে গেছেন। সেই ধারাটি আজও চলছে। সমসাময়িক লেখকেরাও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভ্রমণ লিখছেন, যা এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করছে। এটা ভালো দিক।
দেশে ভ্রমণসাহিত্যের সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?
শাকুর মজিদ : মানুষের মধ্যে পৃথিবীকে জানার আগ্রহ সব সময়ই ছিল। এখন তথ্যপ্রযুক্তির কারণে সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে। অনেক মানুষ হয়তো দূরের দেশে যেতে পারেন না, কিন্তু ভ্রমণকাহিনি পড়ে সেই জায়গার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পারেন। তাই ভ্রমণসাহিত্যের পাঠক সব সময়ই থাকবে। বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও বৈচিত্র্যে ভরা। পাহাড়, সমুদ্র, নদী, গ্রাম—সব ধরনের প্রাকৃতিক দৃশ্য এখানে আছে। পাশাপাশি রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ইতিহাস। তবে আমাদের ভ্রমণ সম্ভাবনা নিয়ে আরও বেশি কাজ করা দরকার। ভ্রমণলেখা ও প্রামাণ্যচিত্র এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভ্রমণকাহিনিতে আমরা শব্দের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা তুলে ধরি, আর প্রামাণ্যচিত্রে সেই অভিজ্ঞতাকে দৃশ্যের মাধ্যমে দেখানো হয়। এই দুই মাধ্যম একে অন্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আর ভ্রমণসাহিত্য আরও অনেককে উৎসাহী করে তুলবে।



