ভ্যানে চড়ে জাহাজমারা থেকে মুক্তারিয়া যাচ্ছি। হাতিয়া দ্বীপের দক্ষিণ-প্রান্তে পাখি-দেখার দীর্র্ঘ একটি দিন শেষ হচ্ছে। ভাঙাচোরা পথ। শরীরের সব শক্তি দিয়ে প্যাডেল মারছেন ভ্যান-চালক। কাঠের পাটাতন আঁকড়ে ধরে আমরা ভূপাতিত হওয়ার ভয় সামলে নিচ্ছি। আমি বললাম, ‘ভ্যানঅলা ভাই, আর তো বসে থাকতে পারি না।’
বিরক্ত, পরিশ্রান্ত চালক স্থানীয় ভাষায় যা বললেন তার সারমর্ম হলো, রাস্তা ভাঙা থাকলে ভ্যান-চালকের কী করার আছে! আমি বললাম, ‘আপনি আস্তে চালাতে তো পারেন।’
রাস্তা ও রাস্তার মালিককে ভ্যান-চালক মেলা গালমন্দ করলেন। ভ্যানের গতি কমল না। আমাদের শিরদাঁড়া কখন টুকরো টুকরো হয়ে যাবে সে দুশ্চিন্তায় কাটল বাকি পথ।
মুক্তারিয়া পৌঁছে তাঁবুতে শুয়ে মেরুদণ্ডের টুকরোগুলো সমান্তরাল রাখার চেষ্টা করলাম। ভ্যান-চালকের কথা তখনও করোটিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তার কথার মর্মার্থ ছিলÑভাঙা রাস্তা সারার কেউ যেহেতু দেশে নাই, তাই কষ্ট লাঘবের জন্য নিজেরা যা পারি তাও করব না। কত সময় যে আমার নিজের ভাবনাচিন্তাও এই একই ধারায় প্রবাহিত হয়েছেÑসে কথা স্মরণ করে মেরুদণ্ডের দুর্বলতাটা গভীরতর মনে হলো।
পাখি-রক্ষার কথা উঠলে আমরাও তো বলি, ‘আমরা আর কী করতে পারি! সারা পৃথিবীতেই পাখি ধ্বংস হচ্ছে।’ প্রতিদিন বন-বাদাড় লোপাট হচ্ছে, জলাভূমি ভরাট হচ্ছে, ঘাস-বন আবাদ হচ্ছে, পাহাড়ে-প্রান্তরে লোকালয় গড়ে উঠছে। শেষ হচ্ছে পাখির বিচরণভূমি ও প্রজনন এলাকা। অনেক পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক পাখির সংখ্যা এত কমে গেছে যে অদূর ভবিষ্যতে এরাও শেষ হবে।
এশিয়া মহাদেশেই এখন পাখি সবচেয়ে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। দ্রুতগতিতে এ মহাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে দ্রুত উন্নয়ন হয়েছে। এখন চীন ও ভারতে হচ্ছে। দ্রুত ধাবমান উন্নয়নের চাকাই পাখির আলয় ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। সংরক্ষণের জন্য সুশীল সমাজের কণ্ঠ জোরালো হওয়ার আগেই পাখি শেষ।
বিশ্বে এখন বিলুপ্তির মুখে আছে শতাধিক প্রজাতির পাখি। এর পঁয়ত্রিশটি প্রজাতি বাংলাদেশে আছে। এর সাত প্রজাতির পাখি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ খুবই বড় অবদান রাখতে পারে। এদের ব্যাপারে আমরা অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু সে কথা আমরা প্রায়ই তেমন জোর দিয়ে বলি না।
ধরে রাখার জন্য সবাই উঠে-পড়ে না লাগলে যে পাখি অচিরে বিলুপ্ত হবে তাকে ‘মহাবিপন্ন’ বলা হয়। বিশ্বের পাঁচটি মহাবিপন্ন পাখি আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এদের নাম গোলাপি-হাঁস, বাংলা-ডাহর, ধলাপেট-বক, সরুঠুঁটি-শকুন ও রাজ-শকুন। গোলাপি-হাঁস ছাড়া বাকি চার জাতের পাখি পৃথিবীর কোথাও কোথাও এখনও টিকে আছে। তবে বাংলাদেশে এদের আর কোনো আশা নেই।
বিশ্বের দুটি মহাবিপন্ন পাখি আজও বাংলাদেশে টিকে আছে : নাম বাংলা-শকুন এবং চামচঠুঁটো-বাটান। এই উপকূলের কাদাচরেই টিকে আছে চামচঠুঁটো-বাটান। নিঝুমদ্বীপ ও দমারচরেও এ পাখি দেখা গেছে। তবে সোনাদিয়ার কাদাচরেই এ পাখি বেশি দেখা যায়। চামচঠুঁটো-বাটান রক্ষার জন্য সোনাদিয়ার লবণ-চাষ ও চিংড়ি-ঘের করা, পাকা বাঁধ দেওয়া এবং পোর্ট বানানোর বিপক্ষে আমরা জনমত গড়ে তুলতে পারি।
মহাবিপন্ন পাখির চেয়ে কিছুটা কম বিপদে রয়েছে যে পাখি তার খেতাব ‘বিপন্ন’। এদের সংরক্ষণের জন্য মানুষের হাতে একটু বেশি সময় আছে। বিশ্বের চার প্রজাতির বিপন্ন পাখি বাংলাদেশ থেকে সম্প্রতি বিলুপ্ত হয়েছে। এদের নাম সবুজ-ময়ূর, বাদি-হাঁস, ধলা-শকুন ও বড়-মদনটাক।
বিশ্বের যে তিনটি বিপন্ন পাখি এদেশে আজও টিকে আছে তার নাম বেয়ারের-ভুতিহাঁস, নর্র্ডম্যান-সবুজপা ও কালামুখ-প্যারাপাখি। কিছু সংখ্যক বেয়ারের-ভুতিহাঁস শীতে টাঙ্গুয়া, পাশুয়া ও হাকালুকি হাওড়ে বাস করে। সোনাদিয়া, দমার-চর ও উপকূলের অন্যান্য চর নর্র্ডম্যান-সবুজপা পাখিদের শীতের আবাস। কালামুখ-প্যারাপাখির জন্য সুন্দরবনের চেয়ে ভালো বাসস্থান বিশ্বে আর নেই। এই সব হাওড়, চর ও বন সংরক্ষণের পক্ষে আমরা কি জনমত গড়ে তুলতে পারি না!
বিপদের ভয়াবহতার দিক থেকে আর এক ধাপ নিচে রয়েছে যে পাখি তাকে ‘সংকটাপন্ন’ বলা হয়। বিশ্বের চার প্রজাতির সংকটাপন্ন পাখি বাংলাদেশ থেকে সম্প্রতি হারিয়ে গেছে। এদের নাম বাদা-তিতির, দেশি-সারস, শতদাগি-ঘাসপাখি ও কালাবুক-টিয়াঠুঁটি। বারো প্রজাতির বৈশ্বিক সংকটাপন্ন পাখি বাংলাদেশে এখনও টিকে আছে। এর মধ্যে চার জাতের পাখি রক্ষা করার বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে আমাদের। এ পাখিদের নাম দেশি-গাঙচষা, ছোট-মদনটাক, পালাসি-কুরাঈগল ও বড়-গুটিঈগল।
বিশ্বে দেশি-গাঙচষার সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও কম এবং ক্রমে তা আরো কমছে। হাতিয়া ও নিঝুমদ্বীপের মাঝে বয়ে যাওয়া মুক্তারিয়া-খাল আর তার পুবে সদ্য জেগে-ওঠা দমার-চরে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশি-গাঙচষার বাস। এখানে টিকে না থাকলে পাখিটি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হতে বাধ্য। নিঝুমদ্বীপকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে সরকার এসব অঞ্চল সংরক্ষণের কাজে হাত দিয়েছে। এ কাজে সমর্থন ও সহায়তা দেওয়ার একটা দায়িত্ব আছে আমাদের।
বড়-মদনটাক চিরবিদায় নিলেও ছোট-মদনটাক বাংলাদেশে আজও টিকে আছে। মদনটাকই বাংলাদেশের বৃহত্তম পাখি এবং সুন্দরবনের বিশাল বাদাভূমি ছাড়া এর টিকে থাকার উপায় নেই। এ পাখি দক্ষ শিকারি নয়, কুড়িয়ে খায়; মৃত মাছ, সরীসৃপ ইত্যাদি খেয়ে বাদাবন সাফ রাখে। সুন্দরবনের পানিতে বিষ, তেল ও অন্য বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব বন বিভাগের। তবে এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজটি কিন্তু আমাদের সবার।
বৈশ্বিক সংকটাপন্ন দুই প্রজাতির ঈগল শীতে বাংলাদেশে বাস করে। এদের নাম পালাসি-কুরাঈগল ও বড়-গুটিঈগল। সিলেট বিভাগের হাওড় অঞ্চলেই এদের বেশি দেখা যায়। হাওড় এলাকাতেই পালাসি-কুরাঈগল বাসা বাঁধে। পাখিটির প্রজননের জন্য এর চেয়ে ভালো জলাভূমি বিশ্বে সম্ভবত আর নেই। বর্ষায় এ ঈগল হাওড়ে থাকে না; হিমালয় পেরিয়ে তিব্বতের হ্রদে চলে যায়। হাওড় ও উপকূলের চর বড়-গুটিঈগলেরও শীতের আবাস। জাহাজমারাতে প্রায়ই ঈগলটি চোখে পড়ে।
ইজারাদারের হাতে বিল ছেড়ে দেওয়ায় বিগত কয়েক দশকে হাওড়-বেসিনে পরিবেশের অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে। হাওড়ের পানি-সহিষ্ণু হিজল-করচ-বরুণের বন উজাড় হয়েছে, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রায় সব শেষ হয়েছে, এখন মাছের আকাল চরমে উঠেছে। সম্প্রতি এই ইজারা-ব্যবস্থা উঠিয়ে হাওড়ে টেকসই ব্যবস্থাপনার কথা উঠেছে। গাছ, মাছ, পাখি ও হাওড়ের অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সোচ্চার হওয়ার এটাই সময়।
বিশ্বের এই সাত প্রজাতির পাখির বিলুপ্তি রোধে বাংলাদেশের মানুষ যে কত বড় অবদান রাখতে পারে সে কথা ক’জন জানে! ভ্যান-চালকের কাছে ভুলেও তো আমরা পাখি সংরক্ষণের কথা বলিনি। হাতিয়ার মানুষের হাতেই রয়েছে বিশ্বের বিপন্ন পাখি নর্র্ডম্যান-সবুজপা, দেশি-গাঙচষা এবং বড়-গুটিঈগল রক্ষার গুরুদায়িত্ব। এ কথা তো ভ্যান-চালককে আমরা বলতে পারতাম।





ছবি : ইনাম আল হক
১ পালাসি-কুরাঈগল
২ বাংলা-শকুন
৩ দেশি-গাঙচষার ঝাঁক
৪ উপকূলে জেলে এবং খয়রা-চকাচকির ঝাঁক
৫ উপকূলে প্রশান্ত সোনাজিরিয়ার ঝাঁক



