আপনার তো ঘুরাঘুরির অনেক শখ। সেটাকে ঠিক লেখালেখিতে নিয়ে আসার ভাবনাটা এলো কীভাবে? ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আর লেখার অভিজ্ঞতাটা মিলিয়েই বলুন।
ফারুক মঈনউদ্দিন : তারুণ্যে কিছুদিন হস্তরেখাবিদ্যা চর্চা করেছিলাম। তখন নিজের হাত দেখে দুঃখ হতো যে আমার বিদেশ ভ্রমণের যোগ নেই। তারপর যখন প্রথমবারের মতো কলকাতা যাই, তখনও সেটাকে বিদেশযাত্রা মনে হয়নি। কারণ জ্যোতিষশাস্ত্রে বিদেশ ভ্রমণ মানে সমুদ্রপাড়ি দেওয়া। উপরন্তু কলকাতাকে বিদেশ বলে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। পরবর্তী সময়ে মুম্বাই গেলেও আমার বিদেশযাত্রা হয় না, কারণ মুম্বাই স্থলপথে যাওয়া যায় বলে সমুদ্রপাড়ির সুযোগ নেই। অবশেষে যখন প্রথমবারের মতো আমেরিকা যাই, তখন বুঝতে পারি আমার হস্তরেখাবিদ্যায় গলতি ছিল।
প্রথমবার কলকাতা যাওয়ার পর থেকেই ভ্রমণের আগ্রহ শুরু হলেও ভ্রমণকে সাহিত্যে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছিল মুম্বাই থাকাকালীন প্রথম আলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হওয়া কলাম মুম্বাইর চিঠি দিয়ে। এছাড়াও মুম্বাইবাসের সময় ভারতের অসংখ্য পর্যটনযোগ্য জায়গায় অবারিত ভ্রমণের সুযোগ আমার মধ্যে ভ্রমণের আগ্রহটাকে উসকে দিয়েছিল। এই আগ্রহ সমুন্নত থাকার পেছনের মূল কারণ, দেশটির পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং ভ্রমণবান্ধব পরিবেশ। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলে এই আগ্রহে ভাটা পড়ত, সন্দেহ নেই। আমাদের দেশের অব্যবস্থা ও উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাবের কারণেই দেশের ভেতরে মানুষের ভ্রমণের সুযোগ ও আগ্রহ থাকে না। প্রথম আলোতে মুম্বাইর চিঠি যখন নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছিল, তখন দেশের একাধিক প্রকাশক লেখাগুলো নিয়ে একটা বই প্রকাশের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে প্রথমবারের মতো সমুদ্রপাড়ি দিয়ে সত্যিকার বিদেশভ্রমণের সুযোগ ঘটে আমেরিকা যাওয়ার পর। আমেরিকা থেকে মুম্বাই ফিরে যাওয়ার পর সেই ভ্রমণের ওপর পর্যায়ক্রমে লেখা শুরু করার প্রণোদনা পাই মুম্বাইর চিঠির পাঠকদের কাছ থেকে ইমেইলে পাওয়া অসংখ্য প্রতিক্রিয়া থেকে। পাকাপাকিভাবে দেশে ফেরার পর প্রায় যুগপৎভাবে মুম্বাইর চিঠির গ্রন্থরূপ ‘মোহিনী মুম্বাই’ এবং আমেরিকা ভ্রমণকাহিনি নির্ঘুম নিউইয়র্ক প্রকাশিত হলে ভ্রমণকে সাহিত্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ হয়েছিল বলা যায়। ভ্রমণকাহিনি লেখার দাবি ও চাহিদার কারণে আমার গল্প লেখার যে ব্যাত্যয় ঘটে, সেটা টের পেতে পেরিয়ে যায় দীর্ঘ সময়।
বাংলাদেশে অনেকেই ভ্রমণ নিয়ে লিখছেন। তবে ভ্রমণ নিয়ে তো সম্ভবত লিখলেই হয় না। একজন ভ্রমণ লেখককে একই সঙ্গে ফটোগ্রাফার এমনকি তথ্য উপস্থাপনেও নিষ্ঠ হতে হয়। এ দিকটা আপনার নিজের লেখাগুলোর আঙ্গিকে যদি বলেন।
ফারুক মঈনউদ্দিন : ভ্রমণ নিয়ে লেখার কাজটাকে যত সহজ বলে মনে করেন অনেকে, কাজটা তেমন নয়। গল্প উপন্যাসে আপনি কল্পনার আশ্রয় নিতে পারেন বলে অনেক কিছুই লিখে ফেলা সম্ভব হয়। কিন্তু ভ্রমণ কাহিনিতে আপনাকে লিখতে হবে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে, ফলে এখানে কল্পকাহিনি লেখার সুযোগ নেই। একইসঙ্গে বাস্তব বর্ণনাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য আপনাকে সাহায্য নিতে হবে সাহিত্যের নানান উপকরণের। তার সঙ্গে উপমা-উৎপ্রেক্ষার সঙ্গে কিছু কল্পনা মিশিয়ে দিতে কোনো দোষ নেই। সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর “সত্যি ভ্রমণ কাহিনী”তে লিখেছেন, ‘ভ্রমণকাহিনী বললেই বুঝতে হবে যে, খানিকটা সত্যের ভেজাল নিশ্চয়ই মেশানো আছে লেখাটার মধ্যে।… রূপকথায় রাজার নফর সফরে যায়, ভ্রমণকাহিনীতে যায় লেখক। … যারা বুদ্ধিমান, তারা ভ্রমণকাহিনীও পড়েনা, … তারা কেনে টুরিস্ট গাইড। এদের চাইতেও যারা কড়াপাকের লোক, … তারা বলে মিথ্যেটাকে মিথ্যের মতো করে লিখলে তাকে বলে উপন্যাস; আর মিথ্যেটাকে সত্যের মতো করে লিখলে হয় ভ্রমণকাহিনী।’ ভ্রমণকাহিনিকে কেবল প্রকৃতি এবং দর্শনীয় স্থানের বর্ণনার মধ্যে সীমিত রাখা যায় না। ফলে আপনাকে পড়াশোনা করে বের করতে হয় জায়গাটার ইতিহাস, ভূগোল ও সমাজতত্ত্ব। সেই সঙ্গে সেখানকার মানুষ, সংস্কৃতি এবং জীবনাচার সম্পর্কেও আপনার পর্যবেক্ষণ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনার পর্যবেক্ষণ শক্তির অনন্যতা, অর্থাৎ অন্যেরা যা লক্ষ করে না, আপনার দৃষ্টি যেতে হবে সেখানে। যেমন সতীনাথ ভাদুড়ীর ফ্রান্স ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হিসেবে লেখা “সত্যি ভ্রমণ কাহিনী” বইটি কেবল একটা সাধারণ ভ্রমণকাহিনী নয়, এটিতে বাস্তবের সঙ্গে রয়েছে কল্পনার মিশেল, ভ্রমণের সাধারণ বর্ণনার বদলে তুলে ধরেছেন নানান দার্শনিক বিষয় ও তখনকার সময়ের চমৎকার চিত্র। কিংবা আমরা যদি বর্তমান সময়ের প্রবল পাঠকপ্রিয় মঈনুস সুলতানের ভ্রমণকাহিনিগুলোর দিকে তাকাই, স্পষ্ট বুঝতে পারি তাঁর বর্ণনার সঙ্গে রয়েছে সমৃদ্ধ কল্পনাশক্তির ফিকশনধর্মী অনুপান। এরকম কাজ তখনই সম্ভব, যখন লেখক নিজেও একজন শক্তিশালী গল্পকার হিসেবে পরিচিত ও প্রমাণিত হন। ভ্রমণের সঙ্গে ফটোগ্রাফির একটা অত্যন্ত ঘনিষ্ট যোগ রয়েছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলে ভ্রামণিকের ছবি তোলার মোটামুটি পারদর্শিতা থাকা উচিত। কারণ ভ্রমণের সময় তোলা ছবিগুলো পরবর্তী সময়ে ট্রাভেল নোট হিসেবে কাজ করে। এমনকি পরবর্তী সময়ে ছবি থেকে বের হয়ে আসে লেখার বহু বাড়তি উপকরণ, যা ভ্রমণের সময় হয়তো দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। তবে ভ্রমণের সময় কেবল ছবি তোলার প্রবণতাও পুরোপুরি ঠিক নয়। প্রকৃত ভ্রামণিকেরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চোখে দেখেন বেশি, প্রয়োজনবোধে ছবি তোলেন পরিমিত।
গোটা বিশ্ব ক্রমেই ভূরাজনৈতিক কারণে সংকটাপন্ন। এ সময় দেশের বাইরে ভ্রমণ অনেক জটিল হয়ে গেছে। আমাদের দেশের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সমস্যাগুলো কী রকম বলে দেখছেন?
ফারুক মঈনউদ্দিন : আমাদের দেশের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সবচাইতে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে আমাদের পাসপোর্টের ক্রমহ্রাসমান গ্রহণযোগ্যতা। এটিকে কেবল সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না, এই সমস্যার জন্য দায়ী আমরাই। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে বিভিন্ন দেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া এবং অবৈধভাবে সেসব দেশে ঢোকা মানুষের তালিকায় বাংলাদেশের নাগরিকদের সংখ্যা কম নয়। পত্রিকার খবরে আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ হয়ে দেশে ফেরত এসেছেন প্রায় সাত লাখ বাংলাদেশি, অর্থাৎ বছরে গড়ে ৭০ হাজার মানুষ । বৈধ পথে বিদেশ গেলেও অবৈধ হয়ে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। যে দেশের নাগরিকেরা বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যায়, সেদেশের প্রকৃত ভ্রমণকারীদের ভিসা দিতে কড়াকড়ি কিংবা একেবারেই না দিলে আমরা কাকে দোষারোপ করব?
দ্বিতীয়ত নানান দেশের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আমাদের জাতভাইদের জীবনযাপন, আচরণ ও ক্রিয়াকলাপ সেসব দেশের নাগরিকদের কাছে কখনো কখনো উৎপাত বলে মনে হয়। সেকারণে পৃথিবীর দেশে দেশে আমাদের দরজা ক্রমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রক্রিয়া দীর্ঘ, কারণ রাতারাতি এই প্রবণতা দুর করা সম্ভব নয়। কারণ, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি, তাদের মালিকানা ও মদদ থাকে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে। এ কারণে অবস্থার পরিবর্তন করার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত। তাই বিদেশে আমাদের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাদের নিজেদেরই চেষ্টা করতে হবে। এখানে সরকারি কূটনীতির ভূমিকাও কম নয়।
এই নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে দেশের প্রকৃত ভ্রমণপিপাসুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বটে, কিন্তু তার কোনো আশু সমাধান অন্তত আমি দেখতে পাচ্ছি না।
তরুণদের অনেকের মধ্যে ভ্রমণের প্রবল আগ্রহ রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের প্রতি পরামর্শ কী? মূলত জানতে চাচ্ছি, অনেকে ভাবেন দেশের অনেক স্থানে আসলে ভ্রমণের স্থান নেই। এমন মনস্তাত্বিক ভাবনা কেন হচ্ছে বলে মনে করেন? নাকি এ বিষয়ে দ্বিমত আছে?
ফারুক মঈনউদ্দিন : ইদানিং আমাদের দেশে ভ্রামণিকের সংখ্যা উৎসাহজনকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর ভেতর। এই তরুণ ভ্রমণকারীদের সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। বয়সের কারণে এঁরা যেকোনো জায়গা ও পরিস্থিতিতে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, সুতরাং তাঁদের জন্য ভ্রমণ হয় সহজ ও ব্যয়বাহুল্যহীন। আবার অন্যদিকে এঁদের অনেকেই পেশাগত জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে বলে তাঁদের হাতে অঢেল টাকা থাকে না, ফলে তাঁদের ভ্রমণের বাজেটও ছোট করতে হয়। আমাদের দেশে ভ্রমণোপযোগী জায়গার অভাব আছে– একথা সত্যি। যেগুলো আছে, সেগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর দরকার ছিল, সেরকম কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খুব সাদামাটা জায়গাও নানান সুযোগসুবিধা ও প্রচারণার কল্যাণে দৃশ্যমান হয় চরম আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে। আমাদের দেশে ভ্রমণোপযোগী যে হাতেগোনা কিছু জায়গা আছে, তার সবগুলো জায়গায় পর্যটন-বান্ধব পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা নেই, তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকে সেসব জায়গায় যেতে আগ্রহ পান না, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির কথা ভেবেও সাহস পান না অনেকেই। তার পরও সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে সাহস করে কেউ কেউ যান বটে, তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে আরো অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা যেতো।
উদাহরণ হিসেবে আমার নিজের কথাই বলা যায়, আমি বিদেশে যতবেশি ভ্রমণ করেছি, তার কণামাত্রও করার আগ্রহ ও সাহস পাইনি দেশের ভেতর । কারণ একটাই– পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধার অভাব ও নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা।
আমাদের ভ্রমণ সাহিত্য বা ভ্রমণ নিয়ে প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রকাশনী এমনকি সংবাদমাধ্যমের বর্তমান ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন?
ফারুক মঈনউদ্দিন : আজকাল ভ্রমণ নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎসাহ ও সম্পৃক্ততা যথেষ্ট বেড়েছে। পত্রিকাগুলো মাঝে মাঝে ভ্রমণসংখ্যা বের করে। এছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী কিংবা সাপ্তাহিক আয়োজনের পুরোটাই কখনো কখনো ভ্রমণগদ্য দিয়ে সাজানো হয়। মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত “ভ্রমণগদ্য” নামের একটা নিয়মিত প্রকাশনা ছাড়া বাংলাদেশে ভ্রমণের কোনো পত্রিকা নেই। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভ্রামণিক থাকলেও মানসম্মত ভ্রমণলেখকের সংখ্যা হাতে গোনা। নতুন ভ্রমণলেখকের সংখ্যা বাড়ছে না বলেই ঘুরে ফিরে নির্দিষ্ট কয়েকজনের লেখা ছেপেই কাগজটার সম্পাদককে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। উপযুক্ত সম্পাদকসহ ভ্রমণপত্রিকার সংখ্যা বাড়লে পর্যাপ্ত সম্পাদনার মাধ্যমে ভ্রমণলেখকের সংখ্যাও বাড়ানো যেতো।
ভ্রমণ নিয়ে কিন্তু তরুণদের মধ্যে লেখার আগ্রহও বেড়েছে। এ দিকটিকে আপনি কীভাবে দেখেন? আমাদের ভ্রমণ সাহিত্যের কী সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ আছে? আর থাকলেও লেখকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
ফারুক মঈনউদ্দিন : একথা ঠিক, আমাদের নতুন প্রজন্মের ভ্রামণিকদের মধ্যে অনেকেই লিখছেন এবং তাঁদের অনেকের মধ্যেই সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে । ব্যাপারটা আশাব্যঞ্জক। সেসব লেখা বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হলেও, সেগুলো মূল ভ্রমণসাহিত্যের স্রোতধারায় এখনো বিশেষ অবদান রাখতে পারছে কি? এবিষয়ে আমাদের লেখক ও সম্পাদকদেরও কিছু ভূমিকা থাকা উচিত। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভা আচমকা আবিষ্কার করতে পারব, এমন প্রত্যাশা করা উচিত নয়। কিন্তু আমাদের দেশের কথাশিল্পী ও কবিদের মধ্যে কজন ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন? কিংবা সম্পাদকেরা তাঁদের কজনকে ভ্রমণ কাহিনি লিখতে তাগাদা দিয়েছেন কিংবা উৎসাহিত করেছেন। প্রতিবছর ঈদ সংখ্যায় কথাশিল্পীদের কাছে সবচাইতে বেশি তাগাদা আসে উপন্যাসের। লেখক বা কবিদের কাছ থেকে কোনো কোনো বছর আগেভাগে কি কখনো তাঁদের সর্বশেষ ভ্রমণ নিয়ে একখানা ভ্রমণকাহিনি চাওয়া হয়েছে? কিংবা চাওয়া হলে তাঁরা দেননি এমন কখনো ঘটেছে? সুতরাং ভ্রমণসাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার জন্য ভ্রমণকারীদের পাশাপাশি সম্পাদকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
যাঁরা ভ্রমণ করেন, তাঁদের মধ্যেও নিজের অভিজ্ঞতাকে পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়া উচিত। তা না হলে কষ্টার্জিত বিদেশি মুদ্রা খরচ করে দেশ-বিদেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত ছবি আর স্মৃতির মধ্যেই থেকে যাবে, সাধারণ পাঠক কিংবা ভ্রমণে উৎসাহী মানুষের কোনো উপকারে আসবে না। যাঁরা ভ্রমণ করে নিজেদের অভিজ্ঞতা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান, তাঁদের উচিত হবে বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের ভ্রমণকাহিনি পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা এবং ভালো লেখার কলাকৌশল বুঝে নেওয়া। অবশ্য যাঁদের লেখার ন্যূনতম যোগ্যতা ও ক্ষমতা নেই, তাঁদের জন্য এই পরামর্শ প্রযোজ্য হবে না। আমি বিশ্বাস করি লেগে থাকলে যে কোনো কাজেই সাফল্য আসে। তবে তাঁদের একটা কথা মনে রাখতে হবে, গদ্য লেখা একটা শ্রমসাধ্য কাজ, সেটা ভ্রমণ, ফিকশন কিংবা নন-ফিকশন, যা-ই হোক।



