আবুল আহসান চৌধুরী। জন্ম ১৩ জানুয়ারি ১৯৫৩ কুষ্টিয়ার মজমপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও উচ্চতর গবেষণা শেষে অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত হন। অধ্যাপনা ছাড়াও সমাজমনস্ক, লোকজ ঐতিহ্যসন্ধানী গবেষক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেও তিনি পরিচিত। অনুসন্ধিৎসু এই গবেষক লোকসাহিত্য-সংস্কৃতির নানা দুষ্প্রাপ্য ও অজ্ঞাত উপকরণ সংগ্রহ, উদ্ধার ও ব্যবহার করে থাকেন। তাঁর লালন সাঁই, কাঙ্গাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেনকে নিয়ে রচিত গবেষণা রয়েছে। গবেষণায় অবদানের জন্য ২০০৯ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। সাড়ে ৩ দিনের পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আমিরুল আবেদিন
লোকসংস্কৃতিকে আসলে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আমরা শুরুতে এই জায়গা থেকেই শুরু করি।
আবুল আহসান চৌধুরী : আসলে বাঙালির সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায় তা এসেছে লোকসংস্কৃতি থেকে। এ কথা আমি আমার একটি বইয়ে বলেছি। মানুষের জীবনচর্চা ও চর্যার সমন্বিত রূপই মূলত সংস্কৃতি। সেই আলোকে বলা যেতে পারে, লোকসংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারা। এই লোকসংস্কৃতির মর্মমূলেই আসলে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় প্রোত্থিত। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, বর্তমানÑএ সবকিছুর সঙ্গেই লোকসংস্কৃতি জড়িয়ে আছে। আর জড়িয়ে আছে বলেই বাঙালি সমাজে এখন লোকসংস্কৃতি নিয়ে প্রবল আগ্রহ দেখা দিতে শুরু করেছে। আমরা লোকসংস্কৃতির কদর করতে শুরু করেছি। লোকসংস্কৃতিকে অন্তত আমি বাঙালির জীবন থেকে একেবারে অবিচ্ছেদ্য বা আলাদা কিছু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি না।
এমনটি আসলে আপনার কেন মনে হলো? কারণ আমরা এখনও যে লোকসংস্কৃতিকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছি এমন নয়।
আবুল আহসান চৌধুরী : সেটাই তো বললাম। ড. ওয়াকিল আহমেদ তাঁর ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থে বাঙালির সংস্কৃতিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। সেখানে তিনি বাঙালির সংস্কৃতিকে আদিম সংস্কৃতি, নগর সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতিÑএই তিনটি ভাগে বিন্যাস করে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তবে আমি মনে করি, লোকসংস্কৃতিই বঙ্গসংস্কৃতির প্রধান ধারা। কারণ আমরা এখনও যে অর্থে নগরায়নের কথা বলি তা কিন্তু এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অপরিণত নগরগুলো এখনও গ্রামীণ সমাজ ও সভ্যতার স্মৃতি ও ছাপ বহন করে চলেছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামই ছিল বাংলার সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র।
আপনার দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবনে আপনি সম্পাদনা, প্রবন্ধ রচনার কাজটি নিরলসভাবে করে গিয়েছেন। আপনার মৌলিক প্রবন্ধ ও সম্পাদনাগুলোর বিশাল একটি অংশ লোকসংস্কৃতি নিয়ে। আপনি লালন ফকির, গোঁসাই গোপাল ও হাসন রাজাকে নিয়ে তো লিখেছেনই। একই সঙ্গে আপনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে লোকসংস্কৃতির প্রভাব নিয়েও তথ্যসূত্র উপস্থাপন করে আলোচনা করেছেন। লোকসংস্কৃতিকেও মূলধারার সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করার বিষয়টি নিয়ে যদি আলোচনা করেন।
আবুল আহসান চৌধুরী : আমরা আসলে ভুলেই যাই, পুরাণ কিংবা লোকজ সংস্কৃতি ছাড়া কোনো ভাষার সাহিত্য গড়ে উঠতে পারে না। এ কথা বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একবার বিদেশের নানা ভাষার সাহিত্যের দিকেই তাকিয়ে দেখুন। সেখানে দেখবেন, পুরাণ কিংবা লোকজ সংস্কৃতি সাহিত্যে নানাভাবে উঠে এসেছে। বলা যায়, লোকসংস্কৃতিই ওই ভাষাগোষ্ঠীর সাহিত্যের ভিত গড়ে দিয়েছে এবং ওই ভাষাগোষ্ঠীও নানাভাবে লোকজ সংস্কৃতির উপাদান থেকে উদারভাবে ঋণ নিয়েছে। এ কথাটি বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও সত্য। আধুনিক বাংলা সাহিত্য নিয়েই আলোচনা করা যাক। আমরা যদি রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করি তাহলে দেখব তিনিও তাঁর অনেক রচনার ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতি থেকে দুহাতে ঋণ নিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর গানে। রবীন্দ্রনাথের গানে যে মরমী আবেদন তা একান্তভাবেই তৈরি হয়েছে লালন ফকির, গগন হরকরা, হাসন রাজার মতো মহৎ মহাজনের গানের প্রভাব থেকে। শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন? বাংলাদেশের সাহিত্যের দিকে তাকান। কবি জসীমউদদীনের সাহিত্যই মূল্যায়ন করুন। জসীমউদদীনের শুধু গানই নয়, তাঁর অন্য রচনাতেও লোকজ জীবন, লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি অসাধারণভাবে মিশে আছে। আর এসব রচনার প্রেরণাও তিনি লাভ করেছেন লোকসংস্কৃতি থেকে। এ কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। এমন অনেক উদাহরণ আসলে টানা যেতে পারে। মূল কথা হলো, লোকসংস্কৃতির প্রেরণা নিয়ে যে সাহিত্য রচিত হয় তার শক্তি এবং স্থায়ীত্ব অন্য প্রেরণার সাহিত্যের তুলনায় অনেক বেশি হয় বলে আমি মনে করি। এজন্যই জসীমউদ্দিন বাংলা সাহিত্যে আজও এত প্রাসঙ্গিক। বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন প্রতিভাবান ও উজ্জ্বল কবি বলেই বিবেচিত ও মূল্যায়িত হন। এর মূল কারণই হচ্ছে, তিনি মাটির কাছাকাছি থেকেছেন এবং মাটির শৈল্পিক ঘ্রাণ গ্রহন করতে সক্ষম হয়েছেন।
একই কথা কিন্তু আল মাহমুদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদিও উনি তার সচেতন জীবনের একটা বিরাট অংশ শহরে কাটিয়েছেন। আর বাংলা সাহিত্যের এমন অনেক কবি আছে যারা শহরে থেকেও তাদের রচনার উপাদান নিয়েছেন লোকজ সংস্কৃতি থেকে। এ বিষয়ে আপনার কী মতামত?
আবুল আহসান চৌধুরী: একটু আগেও কিন্তু আমি একটা কথা বলেছি। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামই বাঙালির সংস্কৃতির মূলমন্ত্র ছিল এবং আছে। আমাদের অনেকেই বড় হয়েছে নগরে। তবে আমাদের মন কিন্তু এখনও পড়ে আছে সেই গ্রামীণ পটভূমিতে। নগরায়নের কল্যাণে আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দান-অবদানকে অকাতরে গ্রহণ করতে পেরেছি। সেসবের সুবিধা ঠিকই ভোগ করছি। ওয়ে ফলে আমাদের যাপিত জীবন হয়ে গেছে শহুরে। কিন্তু যদি একটু পারিবারিক ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে এক কি দুই পুরুষ আগে সবাই গভীরভাবে গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল। দেখা যাবে, আমাদের পূর্বপুরুষদের কেউ গ্রামেই চিরজীবন বসবাস করেছেন এবং তার পরবর্তী পুরুষের কেউ নগরে এসেছেন জীবিকার তাগিদে। এক্ষেত্রে কেউ হয়তো কৃষকের সন্তান। আবার হয়তো কারো পূর্বপুরুষ অন্য কোনো লোকপেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কেউ তেলবণিক, কেউ জেলে, কামার-কুমোর—এমন কত পেশার মানুষ পাওয়া যাবে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে! এই শ্রেণী-পেশার মানুষই শহরে এসে এত রূপান্তরিত হয়েছেন যে এখন আর সেই গ্রামীণ চিহ্নটুকু পাওয়া যায় না। অনেকে তো নিজের নামও পালটে ফেলেছেন। ফলে একটা মেকি শহুরে আদল চলে এসেছে। ফলে শহুরে মানুষের আচার-আচরণ, বেশভূষা ও যাপিত জীবনে এক ধরনের কৃত্রিম ভাব আমরা ঠিকই লক্ষ্য করি। তাই আমি তো বলব যে আমরা এখনও গ্রামীণ শহরেই বাস করি। বলা যায় যে, গ্রামগুলো এখন বিদ্যুতায়িত হয়েছে। বিজ্ঞানের দান-অবদানের বদৌলতে জীবনের মানোন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু ওই গ্রামের যে সামাজিক কাঠামো, লোকজ যে বৈশিষ্ঠ্য তা আজও মুছে গেছে এমনটি বলা যাবে না। এজন্যই মানুষ যতই নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করুক না কেন, তার শেকড়ের টানটাকে কিন্তু কোনোদিন ভুলতে পারবে না, পারেও না। এই শেকড়ই আসলে আমাদের অস্তিত্বের টান। আর এই অস্তিত্বের টানের কারণেই আমাদের বারবার সেখানে পৌঁছুতে হয়। এটা আল মাহমুদের ক্ষেত্রেও বলা যেতে পারে।
তারমানে আমাদের সাহিত্য কোনোভাবেই লোকজ সংস্কৃতির ছাপ থেকে মুক্ত নয়?
আবুল আহসান চৌধুরী: হ্যাঁ। সেটাই বলছি এতক্ষণ। আল মাহমুদের প্রসঙ্গটি টানতে গিয়ে আসলে শহরের এই জীবনের প্রসঙ্গটা টানতে হয়েছে। কারণ শহুরে জীবন-যাপন এবং জীবনের ধরণ আসলে ভোগবাদী। মানুষ যতই ভোগবাদী হোক না কেন, জীবনের একটা অর্থ সবসময়ই খোঁজার চেষ্টা থাকে। এই ভোগবাদী জীবন কোনোভাবেই মানুষকে তৃপ্ত করতে পারে না। অর্থ, বিত্ত, সম্মান, প্রতিপত্তি, যশ কিংবা আধুনিক জীবনের আয়েশ—আপনি যেটাই পান না কেন, একটা সময় এগুলো আপনাকে আর তৃপ্ত করতে পারে না। একটা সময় এগুলো ভীষণ অর্থহীন ও তুচ্ছ মনে হয়। মানুষ অনুভূতিকেই ভীষণ গুরুত্ব দিতে চায়। আর এজন্যই মানুষ শেকড়ের সন্ধানে নেমে পড়ে। তারা আবার পূর্বপুরুষের সেই আদি ভিটে অর্থাৎ গ্রামে ফিরতে চায়। গ্রামে ফিরতে না পারলেও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মাধ্যমে গ্রামীণ সংস্কৃতির কাছে যেতে চায়। এটা আসলে তার নিজের পরিচয়টুকু উদ্ধার করার প্রেরণা থেকে মানুষ করে। এই প্রেরণাই আসলে লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আমাদের প্রবলভাবে আগ্রহী করে তোলে। তারই নিদর্শন সাহিত্য, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোতে প্রচ্ছন্ন কিংবা স্পষ্টভাবে উঠে আসে। যখন তা প্রচ্ছন্ন থাকে, আমরা সচেতনভাবে তা চিহ্নিত করতে পারি না। কিন্তু সেগুলো কিন্তু রয়েছে। আল মাহমুদের কবিতার কথাই ধরা যাক। ওনার নোলক কবিতাটাই দেখুন। এই নোলক একই সঙ্গে বাঙালি মায়ের প্রতীক। আবার এই নোলক একটি সাংস্কৃতিক উপাদানও। এখন এই কবিদের সাহিত্য জীবনের একটা বড় অংশ কিন্তু শহরে কেটেছে। কল্লোল সাহিত্য গোষ্ঠীর মধ্যে বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথের দিকে তাকান। এনাদের সাহিত্য রচনার একটা বড় অংশ কেটেছে শহরে। কিন্তু তাদের কবিতা ও সাহিত্যে লোকজ সংস্কৃতির বহু উপাদান কিন্তু রয়েছে। এগুলো কেন এসেছে? তারা কিন্তু সচেতনভাবেই এসব উপাদান ব্যবহার করে গেছেন।
আপনি তো বললেন, যে নগরজীবনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরও মানুষ সেই শেকড়ের সন্ধানে যেতে চায়। এমনটা কেন হয়? একাডেমিয়ায় লোকসংস্কৃতিকে খুবই স্বতস্ফূর্ত একটি বিষয় বলে অভিহিত করা হয়। সে হিসেবে যখন নগর জীবনে লোকসংস্কৃতির প্রয়োগ হয়, তখন কী তা মেকি হয় না?
আবুল আহসান চৌধুরী: হ্যাঁ। তা হয়। সাহিত্য জিনিসটাকে আমরা কীভাবে মেকির বাইরে বিচার করব? আমি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছি এবং সাহিত্য পড়িয়েছি। সচেতন সাহিত্য তো নির্মাণ করা হয়। সেখানে আমরা বাস্তব পৃথিবীর নানা উপাদান অকাতরে ব্যবহার করি। এই ব্যবহারটি একটি পরিকল্পনার অধীনে হয়। আধুনিক নগর জীবনে নানা সুযোগ-সুবিধা আছে। এগুলো আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। সবকিছুই করেছে দ্রুত এবং আরামদায়ক। কিন্তু এগুলো এতটাই যান্ত্রিক যে মানুষের মন আর অনুভূতি এক সময় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে ওঠে। মানুষ তো যন্ত্র না। যান্ত্রিক জীবন তাকে ক্লান্ত করে। মানুষ চায় অন্য মানুষের সহানুভূতির স্পর্শ এবং নান্দনিকতা। এটুকুই তার ক্লান্ত মনকে শান্তি দেয়। এক ধরনের থিতু অবস্থাই মানুষ চায়। এ জন্য অনেকের মনেই পরিকল্পনা থাকে। আপনি শহরের অনেকের সঙ্গেই আলোচনা করে দেখবেন। ছুটি পেলেই তারা গ্রামে চলে যেতে চান। আবার অনেকে ভাবেন শেষ বয়সে বা শহরে জীবিকা থেকে অবসর নিয়ে তারা গ্রামে গিয়ে থাকবেন। পূর্বপুরুষের ভিটায় তারা আলো জ্বালাবেন। সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশবেন। নিজ অস্তিত্বের পরিচয়টাকে জাহির করবেন। এখানে কিন্তু লোকজ উপাদান আসে। দেখা যায় মানুষ গ্রামে পাকা বাড়ি বানাতে চান। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা টিনের চাল বা খড়ের চালার বাড়ি বানাতে চান। অনেকে কুড়েঘরটাকে বেশ পছন্দ করেন। লোকজ সংস্কৃতি মানুষকে মানবিক করে তোলে। এই যে শহরের জীবন আর শহরের আরাম-আয়েশ এগুলো কিন্তু মানুষকে মানবিক হতে দেয় না। আপনি মেট্রোপলিটান বলুন, কসমোপলিটান বলুন বা অন্য যে কোনো ধারণারই প্রয়োগ করুন না কেন, শহুরে মেকি জীবন আমাদের মানবিক হতে দেয় না। মানুষকে সহজিয়া কিংবা মরমিও হতে দেয় না। বরং মানুষকে আত্নস্বার্থকেন্দ্রিক ও সুযোগসন্ধানী করে তোলে। ফলে মানুষ তার জীবনের চলার পথে নতুন কোনো পথের সন্ধান আর পায় না। আসলে করতেও চায় না। এই নতুন পথের সন্ধানটা পাওয়া যায় লোকজ জীবনে। কারণ লোকজ জীবনটাই প্রকৃতির অনেক কাছে, আমাদের শেকড়ের অনেক কাছে। আর এই শেকড়ের টানটা স্বভাবতই সাহিত্যে আসবে। যারা এনেছেন, তারা বাংলা সাহিত্যে কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক। যারা মেকি ভাবটাকে ধরেই এগিয়েছেন, তারা কিন্তু টেকেননি। বা তারা কিছু সময়ের জন্য জনপ্রিয় ছিলেন। সময়ের পালাবদলে হারিয়ে গেছে।
এখানে আরেকটা প্রশ্ন কিন্তু আসে। গ্রামীণ জীবনও কিন্তু অনেক বদলে গেছে। এটার কারণে কী লোকজ সংস্কৃতি হারিয়েছে?
আবুল আহসান চৌধুরী: হ্যাঁ। তা তো বদলেছেই। কিন্তু সেজন্য লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে বলা যাবে না। আমি তো একটু আগেও বলেছি, আমরা একটা বিদ্যুতায়িত গ্রামেই বাস করছি। এক্ষেত্রে কাঠামো ও সামাজিক পরিমণ্ডলটা শুধু পাল্টেছে। এই যেমন গ্রামীন সমাজে এক সময় যৌথ ও একান্নবর্তী পরিবার কাঠামো ছিল। শহুরে জীবনের জটিলতা এবং জনসংখ্যার চাপের কারণে যৌথ পরিবার কাঠামো ভেঙে গেল। বাঙালির গ্রামীণ আন্তরিকতার পরিবেশও নষ্ট হলো। এমনটি হওয়ার ফলে বাঙালির সংস্কৃতির একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এখন একক পরিবারগুলো অনেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেছে। একক পরিবারে এখন স্বামী, স্ত্রী, সন্তান—এ নিয়েই আমাদের পৃথিবী। অথচ নিকট অতীতেই কিন্তু শুধু নিজ রক্ত কিংবা বংশজাত সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবার গড়ে উঠত না। প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষরাও নানাভাবে পরিবারের অংশ ছিল। সবাই কোনো না কোনো সম্বোধনে আত্নীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এগুলো সবই কিন্তু লোকজ সংস্কৃতিকে প্রাণ দিয়েছে। কারণ এসবকিছুই স্বতস্ফূর্ত এবং স্বাভাবিক ছিল। এই বৃহৎ পরিবারের সুখ-দুঃখ, আনন্দ, উৎসব, পালা, পার্বণ, যোগাযোগব্যবস্থা মিলে নানা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এই কাঠামো ভেঙে পড়ায় কিন্তু আমরা ভীষণভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। আমরা এতটাই রিক্ত, প্রতিভাহীন হয়ে উঠেছি যে এর একটা ইতিবাচক দিক এখনও দেখা যায়। আপনি দেখবেন লোকসংস্কৃতি, লোকসাহিত্য, লোকশিল্প এখন শহরের অনেক সাংস্কৃতিক আয়োজনকে দখল করে ফেলেছে। এমনটি হয়েছে আমাদের নিঃস্ব ও প্রতিভাহীন অবস্থার কারণে। আজকাল অনেক ব্যান্ড সংগীত পরিবেশন করে। তারা আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে। এই ব্যান্ডগুলো কিন্তু লালন, হাসন রাজার গান গায়। লালন, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, বিজয় সরকারের সৃষ্টি শহরকে দখল করে ফেলেছে। আজ এনাদের গান পরিবেশন না করলে বাঙালির সংগীতের ঐতিহ্য পুরোপুরিভাবে উপস্থাপন করা যায় না। এরও কারণ আছে। শহরের মানুষের গান এতটাই যান্ত্রিক, এতটাই কৃত্রিম যে মানুষ তাতে তৃপ্তি পায় না। তাছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো অমেধাবীদের দ্বারা তৈরি বলে মানুষকে স্পর্শ করতে পারে না। মানুষের ক্লান্তি দূর করতে পারে না। মানুষকে উদ্বুদ্ধও করতে পারে না। এজন্যই মানুষ পেছনের দিকে ফিরে তাকানোর চেষ্টা করে। তাই তো লালন ফকির, হাসন রাজা, রাধারমণ, বিজয় সরকার, শাহ আবদুল করিম এনাদের কাছে আমাদের বারবার যেতে হয়। লোকজ সংস্কৃতি থেকেই কিন্তু এনাদের আনতে হয়। এই লোকজ সংস্কৃতির উপাদানকেই আমরা শহরে বাঙালি সংস্কৃতি বলে প্রচার করে থাকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল লোকজ উপাদানকে শহর প্রতারণার আশ্রয়ে বদলে দেয়। এটার বিষয়ে উদাহরণ দেই। শহরে কিন্তু পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। বছরের এই দিনটিতে শহরের মানুষ পান্তা ও ইলিশ ভাজা খেয়ে উদযাপন করে থাকে। এটার চেয়ে বড় প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা বাঙালির জীবনে আর কী হতে পারে? বাঙালির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ভৌগোলিকভাবে বাঙালির যে অবস্থান সেখানে গ্রামের মানুষের একটা বিশাল অংশই পান্তা ভাতের সঙ্গে ভাজা ইলিশের স্বাদ নিতে পারেনি। খাবারের অনুসঙ্গ হিসেবে পান্তা ভাতটা ঠিকই আছে। কিন্তু তার সঙ্গে খাবার হিসেবে অন্য উপকরণ হয়তো ছিল। পান্তাটা বাঙালির একটি শ্রেণীর নিত্যদিনের খাবার। এই শ্রেণীর অনেকের জীবনে আসলে নববর্ষ বলেও কিছু নেই। দেখা যায় নিত্যদিন পান্তা খেতে হচ্ছে। সঙ্গে লঙ্কা, একটু পেঁয়াজ আর নুন। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো বাঙালির অনেকের জীবনে তাই ইলিশ মাছ আয়েশ করে খাওয়া হয় না। তাই শহর লোকজ সংস্কৃতিকে প্রবঞ্চনার ঢঙে উপস্থাপন করে। তবে এই উপস্থাপনের জন্যও কিন্তু তাকে লোকজ জীবনের উপাদানকে নিতে হয়। বাঙালির একটা সমস্যা হলো তারা আত্নপ্রচারে মশগুল থাকে। অথচ নিজের শেকড়ের বিষয়ে তারা বরাবরই আত্নবিস্মৃত হয়ে পড়ে। এজন্যই আমাদের লোকজ সংস্কৃতির নানা উপাদান সম্পর্কে ধারণা থাকে কম। আমরা ভুলে যাই। তাই বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে আমাদের ওই লোকসংস্কৃতির কাছেই যেতে হবে।
এই যে বললেন, আমাদের লোকসংস্কৃতির কাছেই যেতে হবে সেটা আসলে কীভাবে করা যায়? সাহিত্যের কী এখানে কোনো প্রভাব আছে?
আবুল আহসান চৌধুরী: একবার বাংলা সাহিত্যের দিকেই তাকান। আজ বিশ্বের যে প্রান্তেই বাংলা সাহিত্য রয়েছে তার প্রতিনিধিত্ব আসলে কারা করছেন? দেখবেন বাংলা সাহিত্যের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন ফকির, হাসন রাজা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, জসীমউদ্দিন, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ। এনাদের রচনার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাঙালির লোকসংস্কৃতির শক্তিমত্তা কতটুকু। এই শক্তিমত্তার ধরনটা বুঝতে হবে। গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় একজন নিরক্ষর মরমি সাধক লালন ফকির। তার রচিত গানই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শিক্ষিত বিদগ্ধজন গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। আজ লালনের সাধনা, দার্শনিক ভাবনা এবং জীবদ্দশার নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশে-বিদেশে কৌতূহল বেড়েছে। তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার ভাবনার আদলে চর্চা হচ্ছে এমনকি তার দার্শনিক ও সৃষ্টিশীল জীবনকে নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে। মার্কিন মুলুক তো বটেই, ব্রিটেনেও লালন চর্চা হচ্ছে। এখানেই আমাদের শেখার কিছু রয়েছে। কারণ আমরা যে শহুরে জীবনে বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আত্নপ্রবঞ্চনা করি, তা ত্যাগ করতে হবে। লোকজ সংস্কৃতির শক্তিকে ধারণ করে প্রবঞ্চনার অংশটুকু বাদ দিতে হবে। যদি আমরা সেটা না পারি, তাহলে জাতি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের নিয়ে গর্ব করতে পারব না। নিজ ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করে স্বকীয় পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। শহুরে মানুষের চরিত্রটা কেমন হচ্ছে ভেবে দেখুন? শহরের এই জীবনটায় আমরা চতুর ও চালবাজ হচ্ছি। তাতে বরং আমাদের মধ্যে এক ধরনের জালিয়াতি বৈশিষ্ঠ্য চলে আসছে। বাঙালি জাতিসত্বার নিরিখে আমাদের আসলে জালিয়াতি পরিচয়টা ধারণ করা উচিত না। বাঙালি বরাবরই উদার ও শান্তিপ্রিয়। এই ধারণা আমরা পাই লোকসংস্কৃতির উপাদানের দিকে তাকালে। তাই আমাদের সেদিকে ফিরে যেতে হবে। বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক উপাদান রয়েছে। সেগুলো সচেতনভাবে খুঁজে দেখতে হবে। এ নিয়ে চর্চাও বাড়াতে হবে। কাজটা সহজ না। এ জন্য জাতীয় ঐক্য এবং ভাবনার পরিশীলতা জরুরি। শহরের যে আত্নপ্রবঞ্চণামূলক বৈশিষ্ঠ্য আছে সেটা এড়ানো সম্ভব গ্রামীণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে মূল্যায়নের মাধ্যমে। কারণ গ্রামীণ সমাজে যে একতা, যৌথ কাঠামো রয়েছে তা আত্নীয়তাকে আরও বিস্তৃত করতে পেরেছে। এজন্যই লোক সংস্কৃতির মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করতে হবে এবং লোকজ উপাদানের লালিত সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে। যদি তা করা যায় তাহলে আমরা সত্যিকার অর্থেই বাঙালির স্বকীয় পরিচয় পাব এবং গোটা বিশ্বেই আত্নমর্যাদাসম্পন্ন জাতি বলে পরিচিত হব। লোকসাহিত্যকে যদি আমরা লালন ও চর্চার করার মাধ্যমে মর্যাদা দেই তাহলে আমাদের ভেতরে নব উদ্দীপনার সঞ্চার হবে। হয়তো এভাবেই সাংস্কৃতিকভাবে আমরা নিজেদের নতুন করে আলোকিত ও পরিচিত করে তুলতে সক্ষম হব।



